৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রচ্ছদঅন্য খবরনগরে কেটে ফেলা পাহাড়ের ৭৪ শতাংশই পাঁচলাইশ মৌজায়

নগরে কেটে ফেলা পাহাড়ের ৭৪ শতাংশই পাঁচলাইশ মৌজায়

চট্টগ্রামে পাহাড়কাটা বন্ধে সম্মিলিত সমন্বয়, কমিটি গঠন, বিশেষ ইনফোর্সমেন্ট টীম গঠন, হটলাইন প্রতিষ্ঠা, সিডিএ কর্তৃক পাহাড়ি এলাকায় অনুমোদন না দেয়া, পাহাড়ি এলাকায় কোনো ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ না করা এবং তা সুরক্ষার দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রামের পরিবেশকর্মী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিবৃন্দ।

রোববার (১১ জুন) সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের পর্যটন মোটেল সৈকতের সাঙ্গু হলে আয়োজিত চট্টগ্রাম মহানগরের পাহাড় কাটা রোধে মতবিনিময় সভায় এসব দাবি জানানো হয়।

সভায় সূচনা বক্তব্যে ও প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এসময় তিনি বলেন, চট্টগ্রাম নগরে যেসব পাহাড় কাটা হয়েছে তার মধ্যে হিসেব অনুযায়ী ৭৪ শতাংশ পাহাড় শুধু পাঁচলাইশ মৌজাতেই কাটা হয়েছে। আমরা আশা করি আজকের মতবিনিময়ের পর খুব দ্রুততার সাথেই একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি হবে। পাহাড়গুলো সুরক্ষায় সাইনবোর্ড স্থাপনের যে নির্দেশনা তা বাস্তবায়ন হবে।

তিনি বলেন, হাইকোর্ট এবং সরকারের বিভিন্ন সময়ে জারি হওয়া পাহাড় কাটায় নিষেধাজ্ঞার আদেশ উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি এবং খাগড়াছড়িতে কাটা হয়েছে পাহাড়। পাহাড় কেটে কিভাবে জীববৈচিত্র্য রক্ষা হবে? ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রামে ৩২ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার পাহাড় ছিল। ২০০৮ সালে তা কমে ১৪ দশমিক দুই বর্গকিলোমিটারে নেমে আসে।

সরকারের বিভিন্ন সময়ে জারি হওয়া আদেশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৮৩ সালে সরকারি আদেশ ছিল-চট্টগ্রামের কোথাও কোন পাহাড় কাটা যাবে না। ২০০৭ সালে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল- ‘জাতীয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন ছাড়া পাহাড় কাটা যাবে না’। উচ্চ আদালত ২০১২ সালের ১৯ মার্চ আদেশ জারি করেছিলেন, ‘চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং রাঙ্গামাটিতে কোন পাহাড় কাটা যাবে না’।

তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন সময়ে জারি করা আদেশ এবং উচ্চ আদালতের রায় উপেক্ষা করেই এই অঞ্চলে পাহাড় কাটা হয়েছে। উচ্ছেদ করা পাহাড়ে আবার গাছ লাগানোর কথাও বলা হয়েছে। পাহাড় কেটে কীভাবে জীববৈচিত্র রক্ষা হবে সেটি আমাদের মাথায় ধরে না।

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম নগরের উপ-পরিচালক মিয়া মাহমুদুল হক বলেন, আমরা গত কয়েক বছরে মোট ৮৫টি মামলা করেছি। এরমধ্যে শুধুমাত্র ২০২২ সালে এই মামলার সংখ্যা ২২টি। আমরা যে আইনের ভেতরে আছি তার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করার চেষ্টা করছি। কিন্তু চসিক, সিডিএ এবং জেলা প্রশাসনসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সহযোগিতা না পাওয়ায় আমরা সফল হচ্ছি না। সিডিএ যদি নকশা অনুমোদন না দেয় তাহলে আমরা বাধাগ্রস্থ হবো না।

সভায় উপস্থিত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (সিডিএ) এম. জহিরুল আলম দোভাষ বলেন, চট্টগ্রামে আমরা ড্যাবকে ব্যবহার করে পাহাড় কাটা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। আমার সময় আমি পাহাড়ি এলাকায় কোনো প্ল্যান অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেব। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে আমরা পাহাড় রক্ষা করতে পারবো।

প্রধান অতিথি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. রেজাউল করিম বলেন, বাস্তবে পাহাড় নিয়ে স্বাধীনতা পরবর্তীতে কোনো জরিপ হয়নি। আজকের এই মতবিনিময়ে সবাইকে ডাকা হলেও গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর প্রধানদের উপস্থিতি নেই। যে কারণে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সঠিক উদ্যোগ নেয়ায় সমস্যা হবে। চট্টগ্রামে বালির পাহাড়। একটু গর্ত করে দিলেই সেটা ধ্বসে পড়ে। পাহাড় প্রকৃতির সৃষ্টি পাহাড় গড়া যায় না। পাহাড়কে হত্যা করছে দখলকারীরা। ৫০ হাজার, এক লক্ষ টাকা জরিমানা তাদের জন্য নয়। মামলায় এমন হতে হবে পাহাড় খেকোদের যাবজ্জীবন কারাদ-ের বিধান রাখতে হবে। অনেক সময় ভূয়া দলল করে সিডিএ থেকে প্ল্যান নেয়া হচ্ছে। সরেজমিন তদন্ত করে সিডিএ এর প্ল্যান দিতে হবে। পাহাড় রক্ষায় চসিক দায়িত্ব নিবে, তবে চসিকের ক্ষমতার সীমাবন্ধতার কথা ভাবতে হবে। দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি মানুষের অসাধ্য কিছুই নাই। মেয়র হিসাবে ওয়াদা দিতে পারি সমস্ত সংস্থাকে একত্রিত করে একসাথে সোচ্চার করতে কাজ করবে চসিক এই ওয়াদা আমি দিতে পারি।

তিনি বলেন, আমি যেটা মনে করি সেটাই আইন- সেই ধারনা আমাদের পাল্টাতে হবে। চট্টগ্রাম লিংক রোড পাহাড় না কেটেও করা যেতো। ব্যক্তির উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে গিয়ে আমরা প্রকৃতিকে ধ্বংস করছি। পাহাড় কাটলে পূর্বাবস্থায় আনা অসম্ভব। তাই তা কাটা বন্ধের কোনো বিকল্প নেই। আজকে থেকে আর একটি পাহাড়ও কাটতে দেয়া যাবেনা । যারাই পাহাড় কাটবে সম্মিলিতভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। সম্মিলিত সমন্বয় করা হবে। পরিবেশ রক্ষায় একটি হটলাইন প্রতিষ্ঠা ও এর জন্য আলাদা ইনফোর্সমেন্ট টীম থাকার দাবিটি যৌক্তিক। ৯৯৯ এর মতো পরিবেশ সুরক্ষায় যেন সবাই সাথে সাথে তথ্য দিয়ে ফল পায় সেটা আমাদেও করতে হবে। দ্রুততার সাথেই আমরা চট্টগ্রামে একটি কমিটি করবো যাতে আর একটিও পাহাড়ে কোপ না পড়ে।

চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় অন্যান্য বক্তারা আকবরশাহ এলাকার পাহাড় হত্যাকারী অবহিত কওে স্থানীয় কাউন্সিলর চসিক জহুরুল আলমের জসিমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ, পাহাড় সুরক্ষায় বনায়নসহ বিভিন্ন সুপাারিশ করেন। এছাড়াও ওই এলাকাসহ নগরের সকল ওয়ার্ডে পাহাড় নিধন কওে চসিকের যত প্রকল্প আছে তা স্থগিত ও বাতিলের দাবি জানান।

মতবিনিময় সভায় বেশকিছু সুপারিশ করা হয়। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- পাহাড় কাটা রোধে ২০০৭ সালের উচ্চ পর্যায়ের কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন, পাহাড়গুলোর বর্তমান অবস্থা বর্ণনা কওে একটি জরীপ পরিচালনা, পাহাড় কাটা রোধে একটি হটলাইন চালু করা, আর কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে পাহাড় না কাটা, পাহাড় কেটে বাড়ি বা স্থাপনার কোনো পরিকল্পনায় সিডিএ  অনুমোদন দেবেনা মর্মে পত্রিকায় নোটিশ করা, আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনী কর্তৃক বিভিন্ন পাহাড়ে স্থাপনা নির্মাণ অনতিবিলম্বে বন্ধ করা, পাহাড় কাটা রোধে ও পাহাড়ের সুরক্ষায় সমন্বয় সেল বা আলাদা ইনফোর্সমেন্ট সেল বা টীম গঠন ইত্যাদি পাহাড় রয়েছে এমন সকল ওয়ার্ডেজনগণকে সচেতন ও সংগঠিত করা এবং পাহাড়, খাল, ছড়া রয়েছে এসব জায়গায় বিদ্যুৎ, পানিসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধাদি বন্ধ করা।

সভায় ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক সিকান্দার খান, এ এল আর ডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও কাট্টলী সার্কেলের এসি (ল্যান্ড) উমর ফারুক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন ও বক্তব্য রাখেন।

এছাড়াও চট্টগ্রামের পরিবেশবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি ছাড়াও রেলওয়ে, জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষ