আগুন দুর্ঘটনা- এই মুহূর্তে আমাদের জীবনের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এক বিভীষিকাময় আতঙ্কের নাম। ইদানিংকালে প্রায়ই আমরা খবর পাচ্ছি এই ভয়াবহ দানব কারো না কারো উপর জেঁকে বসেছে। এ দানবের লেলিহান শিখায় পুড়ে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ। নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে অনেকের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে এই দানবের করাল থাবায়। আমরা হয়ত এই দানবের লেলিহান শিখায় পুড়ে যাওয়া তাজা প্রাণগুলোকে দেখে আঁতকে উঠছি, হয়ত শোকে মুহ্যমান হচ্ছি কিন্তু এই দানবকে মোকাবেলা করতে আমাদের আসলে কতটুকু সক্ষমতা রয়েছে? কেনই বা এ দানব বার বার আমাদের আক্রমনের সুযোগ পাচ্ছে? সময় এসেছে প্রশ্নের উত্তরগুলো খুঁজে বের করার । আর এই নিয়ে মতামত ব্যক্ত করেছেন গণমাধ্যমকর্ম ী সুমন গোস্বামী
রাজধানী নিমতলী ট্র্যাজেডি…
২০১০ সালের ৩ জুন রাত দশটায় পুরান ঢাকায় ভয়াবহ আগুন লাগে। ধারণা করা হয় ভবন সংলগ্ন একটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সর্ফমার বিস্ফোরিত হরে সেখান থেকে পুরো এলাকায় সকল ভবনগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।আশপাশের দোকানগুলোতে থাকা রাসায়নিক দ্রব্যাদি ও দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে নিমতলী এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় অগ্নিনির্বাপন কর্মীরা সেই এলাকায় যেতে ও কাজ করতে বাধার সম্মুখীন হতে হয় বেশ। এতে বেশ দ্রুত আগুন ছড়ি পড়ে এর কারণে ভবনেগুলোতে বসবাসরত মানুষ আটকা পড়ে যাই। যা বিশ্বের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমগুলো শিরোনাম হয়েছে। এই অগ্নিকান্ডের অন্তত ১১৯ জনের মৃত্যু হয় আর আহত হয়ে প্রায় শতাধিক।
চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড বিএম ডিপো অগ্নিকান্ড….
বিগত ২০২২ সালের ৪জুন রাত ১১ টায় চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে এলাকায় বিএম ডিপো কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। আগুন লাগার পর সারা রাত থেমে থেমে বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণে ঘটনাস্হলের আশপাশের অন্তত চার পাঁচ বর্ণকিলোমিটার এলাকা কেঁপে উঠেছে। অনেক ঘরের জানালা কাচ দরজা ভেঙে গেছে। বেশি ভাগ বাসার টেলিভিশন রেফ্রিজারেটার ও বৈদ্যুতিক লাইট ফ্যান নষ্ট হয়ে যাই। উক্ত বিএম ডিপোতে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড নামের বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক থাকায় আগুন বেশ ভয়ারহ রুপ ধারণ করে।বিস্ফোরণে পুরো এলাকায় কেমিক্যালের বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। কনটেইনার ডিপোতে এত বড় দূর্ঘটনা আগে ঘটেনি।
একের পর এক কনটেইনার বিস্ফোরণে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়ে জনগণের হৃদয়ে অসহনীয় আতঙ্ক সৃষ্টি করে।ভয়ারহ এই আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন ফায়ার সার্ভিস সেনাবাহিনী নৌবাহিনী ও পুলিশসহ সাধারণ মানুষ। দেশের ইতিহাসে সময়ের মাত্রায় দীর্ঘতম এ অগ্নিকাণ্ডে ১৪ জুন পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের ১০ জনসহ সর্বশেষ ৪৯ জনের মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে এবং ৫০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। ঘটনাস্থলে আগুন নিয়ন্ত্রণসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঘোষণা অনুসারে, প্রায় ৬১ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আগুন উত্তাপ বিষাক্ত কালো ধোঁয়া প্রত্যক্ষভাবে আড়াই বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর দূরবর্তী প্রভাব পড়েছে সীতাকুণ্ডের ১০ বর্গকিলোমিটার এলাকায়।
সীতাকুন্ড অক্সিজেন প্লান্টে ভয়াবহ বিস্ফোরণ…
২০২৩ সালের ৫ মার্চ শনিবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে উপজেলার কদমরসুল ইউনিয়নের ছোটকুমিরা এলাকায় সীমা অক্সিজেন প্লান্টে ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা ঘটে। একটি সিলিন্ডারে প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণের পর আগুন লেগে যায়। আশপাশের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট রাত সাড়ে ৭টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
সীতাকুণ্ডের কদমরসুল এলাকায় সীমা অক্সিজেন প্লান্টটি অবস্থিত। সেখানে অর্ধশত শ্রমিক কর্মচারী কাজ করেন। শনিবার বিকাল সাড়ে ৪টায় গ্যাস ভরার সময় এই প্লান্টে হঠাৎ বিকট শব্দে একটি সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে লেগে যায় আগুন। কর্মরত শ্রমিক কর্মচারীরা বিস্ফোরণের সময় প্লান্টের ভেতরে ছিলেন। বিস্ফোরণে কারও কারও দেহের বিভিন্ন অংশ উড়ে যায়। এ সময় শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আগুন থেকে বাঁচতে তারা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের আগ্রাবাদ বায়েজিদ ও সীতাকুণ্ড থেকে ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার অভিযান শুরু করে। হতাহতদের উদ্ধার করে চমেক হাসপাতাল ও আশপাশের হাসপাতালে পাঠান উদ্ধারকর্মীরা। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বেসরকারি অক্সিজেন প্লান্টে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৩২ জন।
২০২২ সালের ৪ জুন রাতে সীমা অক্সিজেন প্লান্ট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর একই এলাকায় সীমা অক্সিজেন প্লান্টের দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা এই শিল্প এলাকার মানুষকে আবারও ভাবিয়ে তুলেছে।
বঙ্গবাজার ভয়াবহ ট্র্যাজেডি…
২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল রাজধানীর বঙ্গবাজারের আগুন ৭৫ ঘণ্টা পর পুরোপুরি নিভেছে। এর আগে মঙ্গলবার সকালে বঙ্গবাজারে আগুন লাগে। ভয়াবহ আগুনে বঙ্গবাজার মার্কেট, মহানগর মার্কেট, আদর্শ মার্কেট ও গুলিস্তান মার্কেটের দোকান পুড়ে যায়। পাশের এনেক্সকো টাওয়ারে ছড়িয়ে পড়েছিল আগুন। ফায়ার সার্ভিসের ৪৮ ইউনিটের চেষ্টায় সাড়ে ৬ ঘণ্টা পর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
নিমতলী,বঙ্গবাজার, বিএম কনটেইনার ডিপো, সীমা অক্সিজেন প্লান্টসহ আরও অনেক ট্র্যাজেডি কি শুধুই দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা বিষয়টি অনেককেই ভাবিয়ে তুলেছে। সরকারের পক্ষ আগুনের ঘটনাগুলো নাশকতা সংশ্লিষ্ট কি না তা নিবিড় তদন্ত করা দরকার আছে। এইসব বড় বড় ট্র্যাজেডি তদন্ত কমিটি করা হয় কিন্তু ফল আসে না।একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও ঘটনা তদন্তে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে । বস্তুত সত্যনিষ্ঠ যথার্থ তদন্তে সত্যিকার দৃশ্যপট প্রতিফলিত হবে এবং প্রাসঙ্গিক কার্যকর সতর্কতা অবলম্বনে সরকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দৃঢ়তার পরিচয় দেবে দেশবাসীর সঙ্গে আমিও একই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।


