ঈদ সামনে রেখে বাড়ছে বেচাকেনা, অর্ডারের অত্যধিক চাপ। এখন যেন দম ফেলার ফুরসত নেই। দিনরাত শুধু কাজ আর কাজ। মেশিন চলছে অবিরাম। রাত গড়িয়ে ভোর হচ্ছে। ক্লান্তি আসে বটে কিন্তু একটুখানি বিশ্রামের সময় বের করা খুবই কঠিন।
বন্দরনগরীর ‘খলিফাপট্টি’, যা দেশের শীর্ষ পর্যায়ের দর্জিপাড়া হিসেবে খ্যাত। এখানকার কারিগররা সুনিপুণ হাতে তৈরি করে থাকেন রকমারি পোশাক। তাদের শ্রমে তৈরি হওয়া এই পোশাক চলে যায় চট্টগ্রাম নগরসহ দেশের বিভিন্ন জেলার প্রসিদ্ধ শপিং মলগুলোতে, যেখানে বিক্রি হয় খুবই উচ্চমূল্যে।
চট্টগ্রাম নগরীর সাব এরিয়া সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী খলিফাপট্টি এখন সরগরম। নাঈরা, শারারা, কুচি গ্রাউন্ড, কাপ্তান কিংবা সালোয়ার কামিজ। ওয়ান পিস, বেবি ফ্রক, ছোট ও বড়দের লেহেঙ্গা, বাচ্চাদের কোটি, মিনি ও লং স্কার্টসহ বাহারি ডিজাইনের রঙিন পোশাকের পসরা নগরীর খলিফা পট্টিতে। যে কোনো ধরনের পোশাক একবার দেখলে তা নিখুঁতভাবে তৈরি করতে পারে এখানকার দর্জিরা। বন্দরনগরীর দর্জিপাড়া হিসেবে খ্যাত খলিফা পট্টি দেশজুড়ে পরিচিত।
এ খলিফা পট্টির দর্জিদের হাতে তৈরি করা পোশাক চট্টগ্রাম নগর, ফেনী এবং তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন মার্কেটে বিক্রি হয়। দোকান এবং কারখানা একসঙ্গে থাকায় স্বয়ংসম্পূর্ণ খলিফাপট্টি। অনেকের শোরুম (দোকান) না থাকলেও ছোট ছোট কারখানা রয়েছে। প্রায় ৩৫০টি দোকান ও কারখানা নিয়ে খলিফা পট্টিতে মেশিনের শব্দ এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে উৎসব আমেজ। ছোটবড় প্রতিটি কারখানায় কাজে নিয়োজিত ১০ থেকে ১৫ জন কারিগর।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রাত ১০টা থেকে ভোররাত ৩টা পর্যন্ত জমজমাট বিকিকিনি চললেও সকাল ১০টা থেকে দোকান ও কারখানার ব্যস্ততা শুরু হয়। ঈদ ঘিরেই তাদের সিংহভাগ কাজ। তাই নির্ঘুম রাতই তাদের জন্য দিন। ১৮ ঘণ্টা কাজ শেষে সেহরি খেয়ে নামাজ পড়ে তারপর ঘুমাতে যায় শ্রমিক কর্মচারীরা। শ্রমিক মানিক হোসেন জানান, ১৭ বছর যাবৎ এ কাজে। ঈদ ঘিরে ব্যস্ততা বেশি। তবে সারাবছরই কাজ থাকে। ফ্রক, কামিজ, লেহেঙ্গা, কোটি সব সেলাই করতে পারি। বিদেশী দেশী পোশাক বিষয় না, একবার দেখাবেন পোশাকটা তৈরি করে দেব। আমি না খলিফা পট্টির কারিগর, (কাটিং মাস্টার) ও অপারেটর (সুইং অপারেটর) সবাই মাস্টারপিস।
সেলাইয়ের পাশাপাশি এই দর্জিপাড়ায় তৈরি পোশাক বিক্রি চলে রাতভর। শাহজালাল গার্মেন্টসের মালিক শাহজালাল জানান, ৭৩ সাল থেকে আমার বাবা হাজী আব্দুল শুরু করেন ব্যবসা, এখন আমিও আছি। এখানে ২৫০ টাকা থেকে ৭ হাজার টাকা দামের পোশাকও আছে। সকাল ১০টা থেকে ভোররাত পর্যন্ত বেচাকেনা চলছে। তার দোকানের পাশেই রূপনা ফ্যাশন। তার স্বত্বাধিকারী আব্দুল রহিম। তিনি বলেন, নাঈরা ও কুচি গ্রাউন্ড এবারের কালেকশান। এখানেই তৈরি হয়েছে। তবে দাম কম। এসব পোশাক বড় বড় শপিং মলে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। আমাদের এখানে সর্বোচ্চ ৭ থেকে ১ হাজার।
খলিফাপট্টির প্রতিটি দোকানেই ফ্রক, ওয়ানপিস, লেহেঙ্গার সমাহার। ঠিক একইভাবে কারখানাগুলোতে চলছে বিভিন্ন ডিজাইনের কাপড় তৈরি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ব্যবসা অনেকে করে গেলেও হারিয়ে গেছে উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, করোনার সময় থেকে এই পর্যন্ত ৫৬ জন পুঁজির অভাবে ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেছে। এখনো যারা ব্যবসা করছে তারা স্ত্রীর গয়না, পৈতৃক সম্পত্তি বন্ধক রেখে বিনিয়োগ করেছে ঈদ বাজারকে টার্গেট করে। ক্ষুদ্র ঋণ ও সরকারের পর্যায় থেকে অর্থ সহায়তা না থাকায় তাদের টিকে থাকা এখন বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে।


