
চট্টগ্রাম একাডেমি প্রবর্তিত লেখিকা ‘মমতাজ সবুর সাহিত্যসম্মাননা ও পুরস্কার ২০২৩’ প্রদান অনুষ্ঠান একুশে পদকপ্রাপ্ত দেশবরেণ্য কবি কামাল চৌধুরী বলেছেন, কবিতা হচ্ছে এক ধরনের অন্বেষণ আর কবির কাজ হচ্ছে অন্বেষাকে জাগিয়ে রাখা। কবিদের বিচরণ করতে হয় পাঠকের হৃদয়ে। বুঝতে হয় তাদের অনুভূতি। তিনি আরো বলেন, সমাজ বিনির্মাণে কবিতার অনেক ভূমিকা আছে। কবিতাকে কখনো কখনো বিবেকের কণ্ঠস্বর হয়ে আবির্ভূত হতে হয়। কবি এই সমাজেরই অংশ। সমাজে যদি কোনো কূপমণ্ডূতা থাকে, কোনো প্রতিক্রিয়াশীলতার উত্থান হয়, তখন কবিকে বিবেকের কণ্ঠস্বর হয়ে আবির্ভূত হতে হয়। কবিকে দেশ, সমাজ এবং কালের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে হয়। বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন জায়গায় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে কবিরা সোচ্চার থেকেছে। ৭৫ পরবর্তী বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আমরা যখন লিখেছি, তখন সেই সময়টাকে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমরা কলমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছি।
আজ (২০ মে) শনিবার বিকেল সাড়ে ৫ টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের বঙ্গবন্ধু হলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলা কবিতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ’ সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে সম্মাননাপ্রাপ্ত কবি কামাল চৌধুরী উপর্যুক্ত বক্তব্য রাখেন।
সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে কবিকে পুরস্কার হিসেবে নগদ অর্থ, ক্রেস্ট ও সনদ প্রদান করা হয়। পঁচাত্তরের পনের আগস্ট পরবর্তী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কবিতা রচনায় সাহসী ভূমিকা ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ জাতীয় পর্যায়ে উদযাপনে তাঁর আন্তরিক ভূমিকাকেও অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
চট্টগ্রাম একাডেমির চেয়ারম্যান ড. অনুপম সেনের সভাপতিত্বে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, গবেষক ড. মাহবুবুল হক, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, আপিল বিভাগের বিচারপতি বোরহান উদ্দিন, কবি ও নাট্যব্যক্তিত্ব শিশির দত্ত, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক কবি মিনার মনসুর, আগ্রাবাদ মহিলা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ড. আনোয়ারা আলম। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন মহানগর দায়রা জজ আজিজ আহমেদ ভ‚ইয়া, মহানগর দায়রা জজ ড. জেবুন নেসা। স্বাগত বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা কবি ও শিশুসাহিত্যিক রাশেদ রউফ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী আয়েশা হক শিমু। অনুষ্ঠানে কবি কামাল চৌধুরীর কবিতা আবৃত্তি করেন আবৃত্তিশিল্পী অঞ্চল চৌধুরী, কংকন দাশ। বৃন্দ আবৃত্তি করেন উঠোন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের বাচিকশিল্পীরা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, গবেষক ড. মাহবুবুল হক বলেন, মমতাজ সবুর ছিলেন একজন সাহিত্যসাধক, সাহিত্যশিল্পী। তিনি গল্প লিখেছেন, কবিতা লিখেছেন, আত্মজীবনী লিখেছেন এবং শিশুসাহিত্য রচনা করেছেন। অল্প বয়সে সংসার জীবন শুরু করলেও তিনি সাহিত্য চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন। তার অনেকগুলো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এই সাহিত্য সাধকের নামে সাহিত্য পুরস্কার চালু হয়েছে এটা অত্যন্ত আনন্দের।
ড. মাহবুবুল হক আরো বলেন, কবি কামাল চৌধুরীর কবিতায় রোমান্টিকতা ধরা পড়েছে। যে কারণে পাঠকের সঙ্গে তাঁর কবিতার মেলবন্ধন ঘটেছে। কামাল চৌধুরী একজন পরিপূর্ণ মানুষ। তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালনকালে পাঠ্যবই প্রণয়নে তাঁর দায়িত্বশীল ভ‚মিকা আমি লক্ষ্য করেছি। সেই দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, সাহিত্যিক মমতাজ সবুর একজন নিভৃতচারী সাহিত্যিক। শত প্রতিক‚লতা উপেক্ষা করে তিনি সাহিত্য চর্চা করে গেছেন। এই রত্মগর্ভা নারীর নামে প্রবর্তিত সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন কবি কামাল চৌধুরী। যিনি পাঠক সমাদৃত একজন কবি। তিনি কঠিন পরিস্থিতিতেও তাঁর দায়িত্বে অবিচল থেকেছেন। জীবনের জয়গান গেয়েছেন।
কবি ও নাট্যব্যক্তিত্ব শিশির দত্ত বলেন, কামাল চৌধুরী বাংলা সাহিত্যের একজন ঈর্ষণীয় কবি। তাঁর চেতনাবোধ পাঠককে উজ্জীবিত করেছে। তিনি মাত্রাবৃত্তের জাদুকর। তার কবিতায় আলাদা ভাব রয়েছে।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক কবি মিনার মনসুর বলেন, ৭৫ পরবর্তী যখন অন্ধকার সময় নেমে এসেছিল সেই অন্ধকার সময়ে কবিতার মাধ্যমে সাহসী ভ‚মিকা পালন করেছেন কবি কামাল চৌধুরী। তিনি মাত্রাবৃত্তের একজন সফল কবি। মাত্রাবৃত্ত তার কাছে পোষা বিড়ালের মতো। তিনি শিল্পের দাবিতে পূরণ করা একজন কবি। তিনি প্রতিনিয়তই তাঁর সৃষ্টিকে ছাড়িয়ে গেছেন। তিনি আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস।
আগ্রাবাদ মহিলা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ড. আনোয়ারা আলম, নিভৃতচারী লেখক ছিলেন মমতাজ সুবর। তাঁর রচিত সাহিত্যে নারী সমাজের জন্য বার্তা রয়েছে। তিনি আরো বলেন, বাংলা কবিতার একজন কীর্তিমান কবি কামাল চৌধুরী। তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে নিজেকে নান্দনিক কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। তাঁর কবিতা সময়ের পর্যবেক্ষক হিসেবে বিবেচিত। তিনি দ্রোহের কবি, তিনি তারুণ্যের কবি।
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, আপিল বিভাগের বিচারপতি বোরহান উদ্দিন বলেন, কামাল চৌধুরী একজন বড় মাপের কবি। তাঁর মতো একজন গুণি মানুষকে মমতাজ সবুর সাহিত্য পুরস্কার দিতে পেরে আমরা আনন্দিত।
স্বাগত বক্তব্যে কবি রাশেদ রউফ বলেন, ৫০ দশকের একজন প্রতিভাবান সাহিত্যিক মমতাজ সবুর। এ গুণি সাহিত্যিকের নামে চট্টগ্রাম একাডেমি সাহিত্য সম্মাননা ও পুরস্কার প্রবর্তন করেছেন। গত বছর এ পুরস্কার পান বরেণ্য কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। এবার পেলেন কবি কামাল চৌধুরী। যিনি কবিতায় অনন্যকণ্ঠস্বর হিসেবে সমাদৃত।
চট্টগ্রাম একাডেমির চেয়ারম্যান ড. অনুপম সেন বলেন, কবিতার মাধ্যমে সমাজকে জাগিয়ে রাখতে হবে। যে কোন সংকটে কবিতাকে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। বাঙালি জাতিকে দ্রোহে-বিদ্রোহে, আন্দোলনে কবিতাই প্রেরণা দিয়েছে। আজকের সংবর্ধিত কবিও তাঁর কবিতার মাধ্যমে এ জাতিকে সুখেদুখে জাগিয়ে রেখেছেন। আলোড়িত করে চলেছেন।


