১৮ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রচ্ছদবিশেষ ফিচারআপন আলোয় রাঙানো এক ক্যানভাস : সেলিম আকতার পিয়াল

আপন আলোয় রাঙানো এক ক্যানভাস : সেলিম আকতার পিয়াল

পায়েল বিশ্বাস
প্রারম্ভিক
চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে কিছু ব্যক্তিত্ব কেবল শিল্পী হিসেবে নয়, বরং সময়ের প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকেন। সেলিম আকতার পিয়াল তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে থিয়েটার, সাংবাদিকতা, আবৃত্তি, সম্পাদনা ও সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত থেকে নিজেকে এক স্বতন্ত্র অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এই রিভিউয়ে আমরা তাঁর শৈশব, শিক্ষাজীবন, সাংস্কৃতিক যাত্রা, সাহিত্য ও সাংবাদিকতা, পেশাগত জীবন, ব্যক্তি দর্শন এবং সমাজসেবার ভূমিকা বিশ্লেষণ করবো। এখানে শুধুমাত্র একজন শিল্পীর নয়, একজন সচেতন নাগরিকের গল্পও উঠে আসবে, যিনি শহরের সাংস্কৃতিক ও মানবিক পরিসরে আলোর দিশারি ছিলেন।
শৈশব ও পারিবারিক প্রভাব
সেলিম আকতার পিয়ালের শৈশব কেটেছে কক্সবাজারে।জন্মেছেন কক্সবাজার বাহারছড়াতে। তাঁর বাবা সরকারি চাকরিতে ছিলেন, ফলে নানান জায়গায় বদলি হতে হতো।
পিয়ালের মা ছিলেন কলকাতার বর্ধমানের মানুষ,
আর তাঁর নানা ছিলেন কক্সবাজার এর ডিস্ট্রিক্ট ইন্টেলিজেন্ট অফিসার। নানা নানী ও মায়ের সাংস্কৃতিক অনুরাগই পিয়ালের জীবনের প্রথম পাঠশালা।
পিয়ালের মা ছিলেন সংস্কৃতিমনা—যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না, তবুও বাংলা সংগীত ও সাহিত্যে তাঁর দখল ছিল ঈর্ষণীয়। নজরুলের প্রায় চার হাজার গানের মধ্যে তিনি সাড়ে তিন হাজার গান মুখস্থ জানতেন। ঘরে নিয়মিত আসতো বেগম, বিচিত্রা এবং ঈদসংখ্যা পত্রিকা। তিনি রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প সন্তানদের পড়িয়ে শোনাতেন।
মা’র এই অবদান পিয়ালের শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
শিক্ষাজীবন ও শুরুর দিনগুলো
পিয়ালের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় কক্সবাজার পিটিআই স্কুলে এবং পরে সিএন্ডবি কলোনি কেজি স্কুলে। এরপর তিনি বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং মহসিন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।
চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বিএ পাস পাশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অনার্সে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই সম্মান ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবনের শুরুতেই তিনি সাহিত্য ও নাটকের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বিভিন্ন পাড়ার পত্রিকা সম্পাদনা, মঞ্চ নাটকের আয়োজন, আবৃত্তি, এবং লেখালেখি দিয়ে তাঁর সাংস্কৃতিক জগতে প্রবেশ ঘটে। স্কুলে আবৃত্তি করে পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা সম্পাদনায় তিনি অল্প বয়সেই যুক্ত হন।
নাট্যচর্চার সূচনা ও অগ্রযাত্রা
সেলিম আকতার পিয়ালের নাট্যচর্চার সূচনা হয় ‘প্রতিভাস’ নাট্যদলে যোগদানের মাধ্যমে। কলেজে পড়ার সময় বন্ধু দীপংকর দস্তিদার, জবা দত্ত,আশীষ রায় চৌধুরী, এবং প্রবাল সেনের প্রেরণায় তিনি দলে যোগ দেন।
সেই সময় তাদের চলমান প্রযোজনা ছিল বাদল সরকারের লেখা ‘ইন্দ্রজিৎ’ নাটক, যার নির্দেশক ছিলেন মুনির হেলাল ভাই। এই নাটক দিয়েই শুরু হয় পিয়ালের মঞ্চজীবন।
পরে তিনি অংশ নেন আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাটকে—এর মধ্যে অন্যতম ‘কোর্ট মার্শাল’ এবং ‘কিনু কাহারের থেটার’, যেটি ছিল চট্টগ্রামে বহুল আলোচিত।
এই নাটক তাঁকে সাংস্কৃতিক মহলে পরিচিত করে তোলে এবং শহরের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে তাঁর প্রতি একটি আলাদা ভালোবাসা তৈরি করে।
শরৎ উৎসব:
এক অনন্য সাংস্কৃতিক প্রয়াস
পিয়ালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক বড় অবদান হল ছাগলনাইয়াতে শরৎ উৎসবের আয়োজন ও নেতৃত্ব। এটি ছিল এক ব্যতিক্রমী আয়োজন, যেখানে সাহিত্য ও সংস্কৃতির মিলন ঘটে। উৎসবটিতে দেশের খ্যাতিমান কবিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের উত্তরীয় পরিয়ে সম্মাননা দেওয়া হয়। কবিদের হাতে উপহার তুলে দেওয়ার দায়িত্বও ছিল পিয়ালের নিজের কাঁধে।
এই আয়োজনের অর্থনৈতিক দিকটিও তিনিই দেখভাল করেন। মিজানুর রহমান মজুমদারএবং কবি মানজুর মুহাম্মদ মোহাম্মদ তাঁর এই উদ্যোগে সার্বিক সহায়তা দেন। অনুষ্ঠানটি শুধু আনুষ্ঠানিকতাই নয়, বরং আন্তরিকতার নিদর্শন হয়ে দাঁড়ায়, যা আজও অনেকের মনে গেঁথে আছে।
পিয়ালের সাংগঠনিক দক্ষতা ও আন্তরিকতা এই আয়োজনে নতুন মাত্রা যোগ করে।
পারিবারিক বাধা ও আত্মসংঘাত
তাঁর সাংস্কৃতিক জীবনের শুরুটা সহজ ছিল না। পরিবারে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে ঘরে ফেরার কঠোর নিয়ম ছিল। নাটকের কারণে এই নিয়ম ভঙ্গ করায় প্রায়ই তাঁকে মায়ের কাছে কৈফিয়ত দিতে হতো, এবং বাবা ক্ষুব্ধ হতেন। নাটকের কথা শুনতেই চাইতেন না। অনেক সময় রিহার্সাল করে বাসায় ফিরতেন হেঁটে—কারণ অর্থ সাশ্রয় করা ছিল জরুরি।
মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা একজন তরুণের জন্য যে সংগ্রাম করতে হয়, পিয়াল তা করেছেন নিয়মিত। কিন্তু কখনো হাল ছাড়েননি।
আবৃত্তি, সংগীত ও সম্পাদনার জগতে পদচারণা
যদিও পিয়াল গায়ক ছিলেন না, সংগীত তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করতে ভালোবাসতেন এবং তাতে ছিলেন অনন্য। চট্টগ্রামে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চে তাঁকে দেখা যেত প্রায়শই—কথার জাদুতে দর্শকদের মন জয় করতে।
তিনি আবৃত্তি ও শব্দভিত্তিক কাজে যুক্ত ছিলেন। দীপংকর দস্তিদারের সঙ্গে তিনি ‘শব্দ সড়ক’ নামক একটি আবৃত্তি ও শব্দনির্ভর প্রজেক্টে যুক্ত হন, যা আধুনিক সময়ে শব্দ ও ছন্দের প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়াতে সাহায্য করে।পরে প্রমায় আবৃত্তিতে নিয়মিত ছিলেন।
সাংবাদিকতা ও লেখালেখির পরিসর
ইন্টারমিডিয়েট শেষে পেশাগত জীবনের শুরু হয় দৈনিক আজাদী পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে। সেখানে ‘আজমিশালি’ নামের একটি বিভাগে কাজ করতেন। তিনি লিখতেন ছদ্মনামে—প্রাঙ্গন পিয়াল,অনিন্দ্য পথিক ইত্যাদি।
সাংস্কৃতিক সমালোচনা, নাট্যচর্চা, কবি ও শিল্পীদের জীবন নিয়ে নিয়মিত কলাম লিখতেন। তার লেখাগুলো স্থান পেত আজাদী, পূর্বকোণ, আধাদিতা সহ অন্যান্য প্রকাশনায়। তাঁর কবিতার গাঁথুনি ও ভাবনাও ছিল গভীর, তবে তা কখনো আত্মপ্রচারে ব্যবহৃত হয়নি।
সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি
সেলিম আকতার পিয়াল শুধুই একজন শিল্পী ছিলেন না—তিনি ছিলেন একজন মানবিক কর্মী। শীতকালে কম্বল বিতরণ, চাল বিতরণ, সমাজসেবামূলক কাজগুলো তিনি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থেকে করতেন। এ কাজে তিনি কখনো প্রচার চাননি। নোয়াখালী নাট্য ফোরাম সহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এসব কর্মকাকর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।
তিনি মনে করতেন, “সংস্কৃতি মানেই মানুষের পাশে দাঁড়ানো।” এই মানবিক দর্শন তাঁর শিল্পীসত্তার গভীরতা প্রকাশ করে।
সাংস্কৃতিক অগ্রগতি ও চট্টগ্রামের বাস্তবতা
চট্টগ্রামের সংস্কৃতি নিয়ে তিনি গর্ব করলেও কিছু সীমাবদ্ধতার কথা স্পষ্ট করে বলেছেন:
১. নাট্যকারের অভাব: চট্টগ্রামে নাটকের লেখক নেই বললেই চলে। অধিকাংশ দল পুরোনো নাটক মঞ্চস্থ করে অথবা ঢাকার নাটক রূপান্তর করে। এর ফলে নিজস্ব নাট্যধারার বিকাশ থেমে যাচ্ছে।
২. হলসংকট: শহরে বর্তমানে মাত্র দুটি হল—যা একে অপরের খুব কাছাকাছি। এর ফলে দূরদূরান্তের দর্শকদের অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়।
৩. দলের ভিতরে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও অনাগ্রহ: অনেক ক্ষেত্রেই দলগুলোর মধ্যে এককেন্দ্রিক নেতৃত্ব, অন্তঃকলহ এবং নবীনদের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের অভাব লক্ষ্য করা যায়।
সম্মাননা ও প্রাপ্তি
সেলিম আকতার পিয়াল বিভিন্ন সংগঠন থেকে বহুবার সম্মানিত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
রাসেল স্মৃতি সংসদ সম্মাননা
লেখক সমিতি, কুমিল্লা
নোয়াখালী নাট্য গোষ্ঠী
ফেনী নাট্য ফেডারেশন
চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংগঠন থেকে বহু সম্মাননা
তবে তাঁর বক্তব্য ছিল, “ডেকে নিয়ে কথা বললে বা কাজ নিয়ে আলাপ করলে সেটাই সবচেয়ে বড় সম্মান।” সম্মাননার সংখ্যা নয়, মূল্যায়নের আন্তরিকতাই তাঁর কাছে বড়।
তিনি বলেন, “এই প্রাপ্তিগুলো ক্যান্সারের লাইনের থেকেও বড়”—এই বক্তব্য তাঁর শিল্পীজীবনের তীব্র সংগ্রাম এবং আত্মপ্রাপ্তির প্রতীক।
ব্যক্তিত্ব ও দর্শন
সেলিম আকতার পিয়াল নিজেকে কখনো সফল বলে দাবি করেন না। বরং তিনি নিজেকে পেশাগতভাবে ‘ঢিলেঢালা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, পেশা এবং জীবনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক আছে। তিনি যেকোনো কাজই করেছেন ভালবাসা থেকে, রুটিন বা নিয়মের বদ্ধতায় নয়।
তিনি বলেন, “আন্তরিকতা থাকলে কোনো চ্যালেঞ্জই বড় নয়।” এই মনোভাবই তাঁকে পরিশ্রমী, মানবিক এবং প্রজ্ঞাবান এক শিল্পীতে রূপান্তর করেছে।
শেষকথা
সেলিম আকতার পিয়াল কেবল একজন নাট্যকর্মী, সাংবাদিক, লেখক বা আবৃত্তিকার নন—তিনি একটি ধারার প্রতীক। চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর মতো মানুষের উপস্থিতি এক ধরণের আলোর উৎস, যা নতুন প্রজন্মকে শিখিয়ে দেয়, কীভাবে প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে নিজেকে গড়তে হয়।
পিয়ালের জীবন নতুনদের জন্য একটি পথনির্দেশনা—যেখানে মেধা, নিষ্ঠা, সংগ্রাম, এবং মানবিকতা একসঙ্গে কাজ করে একজন সত্যিকারের শিল্পীকে গড়ে তোলে।

সর্বশেষ

sakarya escort bayan bayan Eskişehir escort