১৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রচ্ছদঅন্য খবরখালেদা জিয়া: রাষ্ট্রীয় শোক, জনতার জানাজা এবং একটি রাজনৈতিক সময়ের সমাপ্তি

খালেদা জিয়া: রাষ্ট্রীয় শোক, জনতার জানাজা এবং একটি রাজনৈতিক সময়ের সমাপ্তি

ওয়াহিদুজ্জামান বকুল,নর্থ আমেরিকা

ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় নিজ দেশ বাংলাদেশে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসন। তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক বাতাস শোক ও নীরবতায় ভারী হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। দলীয়ভাবে সাত দিনের শোক পালন শুরু হয়। দেশজুড়ে দোয়া মাহফিল, শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এসব আনুষ্ঠানিকতার বাইরেও যে দৃশ্যটি সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি কাড়ে, তা হলো জানাজায় মানুষের ঢল। এটি কোনো দলীয় কর্মসূচি ছিল না, ছিল মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি। রাষ্ট্রীয় শোক ছিল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আর জনতার জানাজা ছিল আবেগের ভাষা। এই দুইয়ের মিলনই খালেদা জিয়াকে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেকে ইতিহাসের এক শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীকে রূপান্তর করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কয়েকজন নেতা ও নেত্রী গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছেন, খালেদা জিয়া তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারার এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। সাহস, দৃঢ়তা এবং বিরোধী রাজনীতিতে তাঁর অবস্থানের কারণে তিনি একটি স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেছিলেন। খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট, দিনাজপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা মূলত শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে পরিচিতির মধ্য দিয়ে হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজস্ব নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তোলেন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপির নেতৃত্বে আসা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়। সেই সময় একটি নেতৃত্বশূন্য দলকে সামনে রেখে তিনি রাজনীতির কঠিন ময়দানে দাঁড়ান। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন। এটি ছিল স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। পরবর্তী সময়ে তিনবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দেশীয় রাজনীতির কেন্দ্রে ছিলেন। তবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন যেমন প্রশংসায় ভরা, তেমনি বিতর্কহীন নয়। তাঁর শাসনামলে কিছু নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ ছিল ভোট-সংক্রান্ত অনিয়ম, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধির বিষয়ে। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা এবং পরবর্তী সময়ে দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর সরকারের ওপর বড় চাপ তৈরি করে। ২০১৮ সালে তিনি নিজেও দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হন, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে সংকটময় অধ্যায়গুলোর একটি। কিন্তু খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তার মূল ভিত্তি গড়ে ওঠে তাঁর শাসনামলের চেয়েও বেশি তাঁর ভোগান্তির সময়ে। ২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়ার সঙ্গে যা ঘটেছে, তা শুধু একজন বিরোধী নেত্রীর ব্যক্তিগত নিপীড়নের কাহিনি নয়। এটি ছিল রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে একটি রাজনৈতিক প্রতীককে ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলার দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এর সূচনা হয়েছিল ২০১০ সালে, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের শহীদ মইনুল রোডের বাসা থেকে তাঁকে যেভাবে উচ্ছেদ করা হয়, তা দিয়ে। প্রায় চার দশক ধরে বসবাস করা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবাহী সেই বাসা থেকে আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় বিদ্যুৎ-পানি বিচ্ছিন্ন করে তাঁকে উৎখাত করা হয়। এটি শুধু একটি বাড়ি হারানোর ঘটনা ছিল না; এটি ছিল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি রাষ্ট্রীয় অবমাননার প্রকাশ। এরপর শুরু হয় মামলার ধারাবাহিকতা। একের পর এক মামলা, যার লক্ষ্য ছিল রায় নয়, বরং একজন মানুষকে মানসিক ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে রাখা। জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার রায়ের মাধ্যমে একজন প্রবীণ, অসুস্থ সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে তিনি শুধু বন্দি ছিলেন না, কার্যত অবরুদ্ধ ছিলেন। উন্নত চিকিৎসা, বিদেশে চিকিৎসা কিংবা বিশেষায়িত চিকিৎসকদের পরামর্শ বারবার প্রত্যাখ্যান করা হয়। কারাগারের বাইরেও তাঁর বাসভবন ছিল অবরুদ্ধ। পুলিশি ব্যারিকেড, নেতাকর্মীদের প্রবেশে বাধা, রাজনৈতিক যোগাযোগ সীমিত করা। একই সময়ে বিএনপির হাজারো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির অভিযোগ ওঠে। এই দমন-পীড়ন খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক নেত্রী থেকে নিপীড়িত মানুষের প্রতীকে রূপান্তর করে। রাষ্ট্রঘেঁষা প্রচারণায় তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই অবিরাম চাপই তাঁর জনপ্রিয়তার একটি বড় উৎসে পরিণত হয়। বাংলাদেশের মানুষ শক্তির রাজনীতি বোঝে, কিন্তু অন্যায়ও গভীরভাবে অনুভব করে। একজন প্রবীণ, অসুস্থ নারী নেত্রীকে রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে অসম লড়াইয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বহু মানুষ তাঁর মধ্যে নিজেদের গল্প খুঁজে পেয়েছে। খালেদা জিয়ার আপসহীনতা ছিল তাঁর জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় কারণ। কেউ একে জেদ বলেছেন, কেউ দৃঢ়তা। কিন্তু ক্ষমতার সামনে নত না হওয়া রাজনীতিবিদের সংখ্যা কম। এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে বিতর্কিত করেছে, আবার একই সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যও করেছে। সমালোচনার মাঝেও তাঁর কিছু ইতিবাচক অবদান স্পষ্ট। প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। শিক্ষা বিস্তারে তাঁর সরকারের নীতির প্রভাব ছিল। বিরোধী রাজনীতিতে তিনি বহুবার রাজপথে দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলেছেন। ৩০ ডিসেম্বর কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু হয়নি; একটি রাজনৈতিক সময়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা ও শোকের মধ্য দিয়ে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে, এবং জাতীয় পর্যায়ে তাঁকে দাফনের সিদ্ধান্ত তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্বেরই স্বীকৃতি। দেশে ও বিদেশে রাজনৈতিক নেতারা তাঁর মৃত্যুতে শোক জানাচ্ছেন, স্মরণ করছেন বাংলাদেশের বহুমাত্রিক রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা। খালেদা জিয়া ছিলেন এক সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক দৃঢ় ও শক্তিশালী নারী নেত্রী। প্রশংসা ও সমালোচনা উভয়ের মধ্যেই তাঁর অবস্থান স্পষ্ট। আজ আমরা একজন মানুষের মৃত্যুতে শোকাহত, কিন্তু ইতিহাসে তাঁর নাম ও ভূমিকা দীর্ঘদিন আলোচিত থাকবে। রাষ্ট্রীয় শোক নির্ধারিত সময়েই শেষ হবে। কিন্তু খালেদা জিয়াকে ঘিরে যে প্রশ্ন, যে আবেগ, যে মূল্যায়ন—তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও বহুদিন বেঁচে থাকবে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন করবেই। আর সেই প্রশ্নের উত্তর কোনো ক্ষমতার চেয়ার দিয়ে দেওয়া যায় না।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

সর্বশেষ

sakarya escort bayan bayan Eskişehir escort