৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রচ্ছদবিশেষ ফিচারহারিয়ে যাচ্ছে শামুক-ঝিনুক

হারিয়ে যাচ্ছে শামুক-ঝিনুক

আজিজুল কদির
বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত হওয়া সত্ত্বে প্রকৃতি যেন নিজেই কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতকে আরো সৌন্দর্যময় করার চেষ্টায় থাকে সবসময়। তাইতো কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ধরে হাটার সময় পর্যটকদের নজর কাড়ে বালিয়াড়িতে পড়ে থাকা বিচিত্রসব রঙিন শামুক-ঝিনুক। সৈকতের পাশে এসব শামুক-ঝিনুককে নিয়ে ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যে গড়ে উঠেছে শত শত দোকান। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স ইনস্টিটিউট এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে আগে এখানে ৩১৭ প্রজাতির মতো শামুক-ঝিনুকের অস্তিত্ব থাকলেও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এর নির্বিচারে নিধন ও আহরণের ফলে বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৫০ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক।
কক্সবাজার জেলার লাবণী, সী-ইন কলাতলী, হিমছড়ি, এসব এলাকা ছাড়াও মহেশখালী, কুতুবদিয়া , ইনানী, উখিয়া-টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপের কূলে শামুক-ঝিনুক দেখা যায়। এই সব শামুক-ঝিনুক দিয়ে তৈরী সামগ্রী গুলো কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের নিকট বিক্রি করা হচ্ছে।
তবে উদ্বেগের বিষয় এই গভীর সমুদ্রে ব্যাপক হারে শামুক-ঝিনুক আহরণের ফলে বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ২৭০ প্রজাতির বিরল শামুক-ঝিনুক । সেন্টার ফর কোস্ট ক্লাইমেট এন্ড কমিউনিটিস ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্স এন্ড ফিশারিজ এর যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। বিরল এসব প্রজাতি অবাধে বিক্রি হচ্ছে কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ দেশের সমুদ্র সৈকত গুলোতে।
কক্সবাজার আর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে সারিসারি দোকান দেখা যায় শামুক,ঝিনুকের । তার মধ্যে চিলশামুক, জলসংখ, নীলসংখ, নকশি ঝিনুক সহ অন্তত পঞ্চাশ প্রজাতির শামুক ঝিনুক প্রজাতি অবাধে বিক্রি হচ্ছে সৈকতে। আর এসব মূল্যবান শামুক ঝিনুক দিয়ে তৈরীকৃত নানারকম শোপিচ,গহনা প্রিয়জনকে উপহার দিতে কিনে নিচ্ছেন কক্সবাজারে আসা পর্যটকরা।
মেরিন সায়েন্স বিভাগের প্রফেসর সাইদুর রহমান চৌধুরী জানান, প্রতিবছর গভীর সমুদ্র থেকে মাছ শিকারের সময় অন্তত ১০০০ মেট্রিক টন শামুক ঝিনুক আহরণ করছে জেলেরা। ২০১৪ সালে আমাদের গবেষণায় যেখানে ৩১৭ প্রজাতির শামুক ঝিনুক সন্ধান পাওয়া গেছে এখন সেখানে দেখা মিলছে ৫০ প্রজাতির। এটি রোধ করা না হলে পযর্টন রাজধানী কক্সবাজার আর প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের পুরোটাই পড়বে হুমকির মুখে।
শামুক-ঝিনুক অবৈধ আহরণের সত্যতা নিশ্চিত করে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী পরিচালক সাইফুল আশ্রাব বলেন, শামুক-ঝিনুক পরিবেশ রক্ষার একটি উপাদান। আর রাতের আধাঁরে কিছু অসাধু জেলে অবৈধ ভাবে শামুক-ঝিনুক অহরণ করে পরিবেশের মারাত্বক ক্ষতি করছে। গত মাসেও কক্সবাজার রেজুরখাল থেকে থেকে ৯ মেট্রিক টন শামুক-ঝিনুক জব্দ করেছি । এর মধ্যে মামলাও হয়েছে। তবে লোকবলের অভাবে এত বড় উপকূলে পাহারা দেয়া সম্ভব হয় না। তবু যতটুকু সম্ভব নিয়মিত আমরা উপকূলে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। প্রাকৃতিক এই সম্পদ রক্ষায় আমরা সদা সচেষ্ট আছি।
কক্সবাজার পরিবেশ বাচাঁও আন্দোলন কর্মী সাংবাদিক তৌফিক লিপু জানান, দীর্ঘদিন ধরে উপকূলে শামুক-ঝিনুক আহরণ চলছে নিয়মনীতি তোয়াক্ক করে । মাঝে-মধ্যে ধরপাকড় হয়, যেটা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। একটি সিন্ডিকেট পরিবেশ সংরক্ষণ আইনকে তোয়াক্কা না করে শামুক-ঝিনুক পাচার করে যাচ্ছে। ঝিনুক শিল্পের সমস্যা, সম্ভাবনা ও উত্তরণের জন্য সরকারীভাবে একটি নীতিমালা প্রণয়ন, বিলুপ্ত প্রজাতির শামুক ঝিনুক রক্ষায় রক্ষিত জোন সৃষ্টি করা জরুরী। অন্যথায় কক্সবাজার সৈকতে অবাধে শামুক ঝিনুক আহরণ জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের হুমকি হবে চরম।

সর্বশেষ