১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রচ্ছদবিশেষ ফিচার'তঞ্চঙ্গ্যা ফোকলোরোগ্রাফি' প্রসঙ্গ

‘তঞ্চঙ্গ্যা ফোকলোরোগ্রাফি’ প্রসঙ্গ

গত বছর কলকাতা থেকে আমার আমন্ত্রণে অতিথি হয়ে রাঙ্গামাটি এসেছিলেন প্রখ্যাত লোকসংস্কৃতি বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. শেখ মকবুল ইসলাম স্যার । তিনি ২০-২৬ ডিসেম্বর-২০২২ পর্যন্ত আমাদের ‘অরণ্য’ নিবাসে ছিলেন। তিনি যখনি আসেন প্রতিবারই আমরা রাঙ্গামাটির বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় গমনাগমন করে সেখানকার জনজীবন দেখা ও জানার চেষ্টা করেন। বিশেষতঃ তিনি এখানকার নৃগোষ্ঠীর ভাষা-সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি এবং জীবনধারা গভীরভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করেন।
ছবিতে বাঁ থেকে- ড. শামসুদ্দিন শিশির, ড. আজাদ বুলবুল, প্রফেসর ড. শেখ মকবুল ইসলাম, শাওন ফরিদ ও প্রফেসর হোসাইন কবির। চট্টগ্রাম।

এবার সময় সল্পতার কারনে খুব বেশি জায়গায় যাওয়ার সুযোগ হয়নি। আমরা গিয়েছিলাম লেখক-গবেষক ও চিত্রশিল্পী আমার গুরুজী বাবু রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যার প্রতিষ্ঠিত রাঙ্গামাটি চারুকলা একাডেমিতে। প্রফেসর মকবুল ও রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যা দুজন দু’জনকে পেয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন। এরিমধ্যে খবর দিয়ে আনলেন জগদীশ তঞ্চঙ্গ্যাকে। দীর্ঘ সময় তঞ্চঙ্গ্যা জাতির জীবনধারা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা হয়। চারুকলা একাডেমিতে রতি বাবুর সংগ্রহকৃত মিনি জাদুঘর ও লাইব্রেরির বই তঞ্চঙ্গ্যাদের ব্যবহারিত উপকরণগুলো নিয়ে নানান কথা হলো। ছবি তোলা হলো। সেদিন বাসায় এসে প্রফেসর মকবুল তঞ্চঙ্গ্যাদের নিয়ে ডায়েরি লেখা শুরু করলেন। আমারও বুঝতে বাকি নেই তিনি তঞ্চঙ্গ্যায় বেশ মজেছেন। দেখলাম রতিবাবু ওনাকে মোহাবিষ্ট করে ফেলেছেন।

এবার শুরু হলো তঞ্চঙ্গ্যা গ্রামীণ জনজীবন দর্শনের পালা। কোথায় যাবো, কাছাকাছি কোথায় যাওয়া যায় ভাবছিলাম। ভাবতে ভাবতে হঠ্যাৎ ফারুকের (ওমর ফারুক) কথা মনে এলো। সেতো একবার কোন এক তঞ্চঙ্গ্যা গ্রামে ঘুরতে যেতে বলেছিল। ওর সাথে যোগাযোগ করে সব ঠিকঠাক করা হলা। আমরা ‘ওগোয়েছড়ি’ গ্রামে যাবো। যথারীতি গেলাম, সারাদিন ছিলাম, ওদের প্রাণখোলা আতিথিয়েতা গ্রহণ করেছি। আমাদের ভ্রমণসহ সবি ছিল প্রাণবন্ত ও মুগ্ধতায় আবিষ্ট।
সেদিন ছিল ২৫ ডিসেমম্বর ২০২২। প্রতি বছরের মতো এবারও বড়দিন উপলক্ষে বেশ কয়েক গ্রামের পাংখোয়ারা আমাদের স্ব-পরিবারকে নিমন্ত্রণ করে ছিল। তার মধ্যে কাপ্তাই উপজেলার দূর্গম ১১৯ নং ভায্যাতলী মৌজার হরিণছড়া পাংখোয়া পাড়ার আর দৌলিয়ান’দা একজন। তিনি স্যারের আগমনের কথা শুনে বারে বারে কল করে অনুরোধ জানিয়েছেন; যেন প্রফেসর মকবুল স্যারকে নিয়ে আমরা তাঁর বাড়ীতে অতিথি হই। আমরা সকালে স্প্রীটবোটে করে রওনা হয়ে হরিণছড়ায় পৌঁছলাম। সেখানে আশেপাশে কয়েকটি তঞ্চঙ্গ্যা গ্রাম আছে। বড়দিনে তারাও পাংখোয়াদের আমন্ত্রিত অতিথি হন। ইতিপূর্বেও আমি তা দেখেছি। আমাদের পেয়ে পাংখোয়ারা বেশ খুশি দেখলাম। আমরা যাওয়াতে তারা বার বার কৃতজ্ঞতা জানালেন। তাদের পূর্ব নির্ধারিত অনুষ্ঠানসূচী অনুযায়ী চার্চে ধর্মীয় কার্যক্রম শেষ করলেন। আমরাও তাতে অংশগ্রহন করেছিলাম। দ্বীতিয় পর্বে ছিল আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ওখানে দেখলাম জনা পঞ্চাশেক তঞ্চঙ্গ্যা নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরী উপস্থিত আছেন। অনুষ্ঠান শেষ, এবার শুরু হলো তঞ্চঙ্গ্যাদের সাথে মকবুল স্যারের বৈঠক- আলোচনা, প্রশ্ন-উত্তর পর্ব। গবেষণার পদ্ধতি বিজ্ঞান অনুসরণ করে অজানাকে জানার নানান প্রচেষ্টা। তিনি জানেন কোন পরিবেশে, কিভাবে, কোন পদ্ধতিতে বা কৌশলে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। কথার ফাঁকে ফাঁকে চলে একটুআধটু হাসিতামাশা। মনেহলো উপস্থিত যুবক-যুবতীরাও বেশ আনন্দে উচ্ছ্বসিত ছিল।
এসবকিছু মিলিয়ে দিনটি ছিল আমাদের কাছে অবিস্মরণীয়। মকবুল স্যারও বেশ আনন্দিত ও উজ্জীবিত ; তঞ্চঙ্গ্যাদের খুব কাছে পেয়ে এবং তাদের কাছ থেকে আশানুরূপ তথ্য ও সহযোগিতা পেয়ে। পরে তিনি জানালেন যে, তিনি এতোটাই ভাবেননি এবারের রাঙ্গানাটি সফর সকল কিছু এভাবে সুসম্পন্ন হবে।
প্রফেসর ড. শেখ মকবুল ইসলাম স্যার ২০২২ সালে রাঙ্গামাটিতে সফরে এসে সরজমিনে প্রত্যান্ত গ্রাম ঘুরে ও তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ এবং তঞ্চঙ্গ্যাদের সাথে একাকার হয়ে তাদের জীবনধারা জানার চেষ্টা করেছেন। তিনি রতিকান্ত বাবুকে কথা দিয়েছিলেন তঞ্চঙ্গ্যা জাতিকে নিয়ে কিছু একটা লিখবেন। রতিবাবুও বার বার অনুরোধ করেছিলেন সেটি যেন খুব তাড়াতাড়ি হয়। তিনি বলেছিলেন “অনেক বয়স হয়েছে, তার উপর শরীর আগের মতো চলেনা। আমি বেঁচে থাকতে দেখে যেতে পারলে মনে একটু শান্তি পাবো” মকবুল স্যার যখনি কলকাতা থেকে আমাকে কল করতেন রতিবাবুর খবরাখবর জানতে চায়তেন। তিনি বলতেন “দোয়া করবেন ফরিদ ভাই, আমি যেন আমার কথা রাখতে পারি। রতিকান্ত বাবুর হাতে যেন তঞ্চঙ্গ্যা জাতির বইটি তুলে দিতে পারলে আনন্দিত হবো।”
গত ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখ মকবুল স্যার বাংলাদেশে আসছেন। সরাসরি তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় এলেন। ১০-১১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত সুফিবাদের উপর একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহন করেন। ১২-১৪ সেপ্টেম্বর তিনি মাইজভান্ডার শরীফের অতিথি হয়ে মাইজভান্ডারী সুফিতত্ত্ব সম্পর্কে গবেষণার জন্য ফটিকছড়ি- খুলশীতে ছিলেন। স্যার বার বার বলছিলেন “ফরিদ ভাই আমাদের দেখা কি হবেনা।”? আগেই তাঁকে বলেছিলাম দুএক দিনের জন্য আপনি রাঙ্গামাটি আসবেন না, আমিও আসতে বলবো না। ভাবলাম তিনি এতদূর থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এলেন ; যাই দুদিন একসাথে কিছুটা সময় কাটিয়ে আসি।
মকবুল স্যারের সাথে আমিও প্রিয়জন তসলিম ও শিশির স্যারের অতিথি হলাম। বন্ধু ড. আজাদ ও প্রফেসর হোসাইন কবির, শিল্পী দীপক’দাসহ আরো কয়েকজন গুনি মানুষের সাথে আড্ডা দারুণ উপভোগ করেছিলাম।
ও হ্যাঁ এরি মধ্যে মকবুল স্যার, ওস্তাদজী রতিকান্ত বাবু ও আমাদের মাননীয় সাংসদ বাবু দীপংকর তালুকদার দাদা এবং জগদীশকে দেয়ার জন্য “তঞ্চঙ্গ্যা ফোকলোরোগ্রাফি” আমার হাতে তুলে দিলেন। আজ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩। সকালে লালখান বাজারস্থ শিশির ভাইয়ের বাসা থেকে একসাথে বের হলাম। স্যারকে নিয়ে শিশির ভাই এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন আমি ‘তঞ্চঙ্গ্যা ফোকলোরোগ্রাফি’ ও মকবুল স্যারের কথা তন্দ্রাঘোরে ভাবতে ভাবতে কখন যে মানিকছড়ি পাহাড় ডিঙ্গিয়ে টিভি ভবন এসে পৌঁছলাম একটু পাইনি টের। মনেহলো দুইমাস পর রাঙ্গামাটি আসলাম। আহা.. …কিযে শান্তি লাগছে….মনটা জুড়িয়ে গেল। আমার প্রাণের রাঙ্গামাটি।
আজ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ জগদীশকে আগেই বলে রেখেছিলাম আজ চারুকলায় যাবো। ১২টায় জগদীশ এলো। ওস্তাদজী বাবু রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যা”র হাতে বইটি তুলে দিতে পেরে অনেকটা ভারমুক্ত হলাম।

সর্বশেষ