১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রচ্ছদঅনুরণনস্মৃতির ফ্রেমে প্রিয় বাবার মুখ

স্মৃতির ফ্রেমে প্রিয় বাবার মুখ

মুহাম্মদ মোতাহেরুল ইসলাম টিপু

‘বাবা ‘ এমন এক ব্যক্তি যাঁর কাঁধে সন্তান পরম নির্ভরতায় মাথা রেখে বড় হয়। আমরা চারভাই-দুইবোনও ছেয়েছিলাম আমাদের বাবার  কাঁধে মাথা রেখে বড় হতে । কিন্তু চাইলেই তো সব ইচ্ছা সবসময় পূরণ হয়না। সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি মানুষের জীবনের ছক যেভাবে এঁকেছে ন,  ঠিক সেভাবেই জীবন এগিয়ে যাবে। আমার ভাই-বোনদের জীবনে বাবার আদর,স্নেহ,ভালবাসা পাওয়ার ক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্তা ভিন্নভাবে ছক এঁকেছেন। তাইতো আমরা বাবার স্নেহ কি তা বুঝে উঠার আগেই দেখি, বাবা আমাদের ফাঁকি দিয়ে সৃষ্টিকর্তার দরবারে পাড়ি দিয়েছেন। ভাইবোনদের মধ্যে সবার বড় আমার আপা  তখন সবেমাত্র স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে পা দিয়েছেন। ভাইদের মধ্যে বড় আমি অষ্টম শ্রেণীতে এবং সবার ছোট বোনটির বয়স তখন  মাত্র ছয় বছর। বাবা কেমন হয়-তা সে কোনদিন বুঝার সুযোগ পায়নি। বাবাকে নিয়ে আজ লিখতে বসে শুধু হাতরিয়ে যাচ্ছি বাবার সান্নিধ্য পাওয়া আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মৃতিটুকুকে।

আমার দাদারা ছিলেন দুই ভাই। মরহুম আবদুল হাকিম এবং মরহুম আবদুর রহিম। নিজ গ্রাম শিলাইগড়ার বশির উল্লাহ মাতব্বর বাড়ী থেকে আমার দাদা আবদুল হাকিম আমার দাদী মরহুমা মোসাম্মৎ ছমনা খাতুনকে বিয়ে করেন। সে সংসারে জন্ম গ্রহণ করেন আমার ফুফু মরহুমা ফাতেমা বেগম এবং আমার বাবা মরহুম মোঃ আবদুল মোতালেব। আমার আব্বার ছোটকালে আমার দাদী মারা যান,পরবর্তীতে দাদা আবার বিয়ে করেন। সেখানে আমার দুই চাচা এবং তিন ফুফু রয়েছেন। আমার দাদার ছিলেন আমাদের গ্রামের বেশ অবস্থা সম্পন্ন কৃষক পরিবার। আমাদের বংশের প্রবীণ ব্যক্তি জনাব আবদুচ ছমদ দাদার  কাছে শুনেছি আমার দাদার ধানের গোলায় ৩/৪ বছরের পুরানো ধানও থাকত। তাছাড়া বড় বড় বলদ গরুর হালের জন্যও আমার দাদার এলাকায় বেশ সুনাম ছিল। আমার দাদা কৃষক হলেও লেখাপড়ার প্রতি যথেষ্ঠ আগ্রহী ছিলেন। আমার বাবাকে লেখাপড়া শিখে আলোকিত মানুষ হওয়ার জন্য তিনি যথেষ্ঠ সচেতন ছিলেন। বড় বোন ফাতেমা বেগমের সার্বক্ষণিক তত্ত্ববধান এবং ছোট দাদার স্নেহে আমার বাবা কঠোর অধ্যাবসায়ের জোরে লেখাপড়ায় ভাল রেজাল্ট করতে থাকেন। শুনেছি ম্যাট্রিক পরীক্ষার পূর্বে দিন রাত পড়তে পড়তে আমার বাবার নাকি মাথা পাগল হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহর রহমতে বাবা ম্যাট্রিক পাশ করেন। তখনকার সময়ে ম্যাট্রিক পাশ করা খুবই কঠিন ব্যাপার ছিল। একমাত্র ভাল লেখাপড়া জানা ছাত্র/ছাত্রীরা পাশ করতে পারত। বাবা পাশ করার পর অনেক দূর দূরন্ত গ্রাম থেকে লোকজন বাবাকে দেখতে এসেছিল। এরপর ইন্টারমিডিয়েট, বি.এ. পাশ করে ময়মনসিংহ টিচার ট্রেনিং কলেজ থেকে বি এড পাশ করেন।

লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে আমার বাবা যখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের অপেক্ষায়, তখন চারিদিকে সরকারি চাকুরির বেশ লোভনীয় অফার। শুনেছি বাবার নাকি সরকারি চাকুরি করে আমলা হওয়ার খুবই ইচ্ছা ছিল। বাবার সিনিয়র এবং সহপাঠী দু’একজন সরকারি চাকুরিতে যোগদানও করেছেন। একদিন বাবা দাদাকে সরকারি চাকুরি করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে দাদা নাকি বলেছেন, আমার অবস্থা এত খারাপ হয়নি যে, তোমাকে দূরদেশে গিয়ে চাকুরি করে সংসার চালাতে হবে। লেখাপড়া শিখে নিজে শিক্ষিত হয়েছো, এবার সমাজের গরীব অসহায় ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার আলো দান করে তাদেরকে শিক্ষিত, স্বাবলম্বী করে তোল। দাদার কথাকে শিরোধার্য করে বাবা যোগ দিলেন শিক্ষকতার মহান পেশায়। বটতলি মোহছেন আউলিয়া স্কুল দিয়ে শুরু। এরপর চাতরী স্কুল, কৈনপুরা স্কুল ঘুরে ১৯৬৭ সালে আনোয়ারা স্কুলে যোগ দেন। আনোয়ারা স্কুলে দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে ১৯৮০ সালে এক তিক্ত ঘটনার কারণে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দেন।

বাবার ইস্তফার কথা প্রকাশ হওয়ার পর অনেক স্কুলের পরিচালনা কমিটি বাবাকে তাঁদের স্কুলে প্রধান শিক্ষক হওয়ার জন্য অনুরোধ নিয়ে আসেন। আমি দেখেছি দৌলতপুর স্কুল থেকে একজন শিক্ষক ২/৩ দিন পর পর সাইকেল চালিয়ে আমাদের বাড়ীতে আসতেন, আমার বাবাকে দৌলতপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক হওয়ার অনুরোধ নিয়ে। আড়াল থেকে আমি দেখতাম সেই শিক্ষক করুণ স্বরে বাবাকে রাজী হওয়ার জন্য অনুরোধ করতেন আর বাবা চিন্তামগ্ন হয়ে চুপ হয়ে থাকতেন। অনেকক্ষণ পর হতাশ হয়ে সেই ভদ্রলোক চা নাস্তা খেয়ে সাইকেল চালিয়ে চলে যেতেন। এই রকম কয়েকবার আসার পর আমি একদিন বাবাকে বললাম, ‘আব্বা আপনি রাজি হচ্ছেন না কেন?

আর যদি আপনার ওখানে যেতে ইচ্ছা না করেন তাহলে লোকটাকে আর আসতে বারণ করে দেন। বাবা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন, আনোয়ারা স্কুল আর দৌলতপুর স্কুল তো এক নয়। একটা পুরানো ঐতিহ্যবাহী স্কুলে দীর্ঘ সময় প্রধান শিক্ষকের পদে আসীন ছিলাম। এখন কি করে একটা অপরিচিত স্কুলে যোগ দেই। ২/৩ দিন পরে দৌলতপুর স্কুলের সেই শিক্ষক আবার বাবার সাথে দেখা করতে আসলেন। বাবার সাথে কথা বলে চা খেয়ে বেশ খুশি মনে চলে গেলেন। আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, আব্বা আজকে দৌলতপুর স্কুলের স্যারটাকে বেশি খুশি খুশি মনে হচ্ছে, কারণ কি? বাবা  হেসে বললেন, “আমি আজ সম্মতি দিয়েছি তাই।” সত্যি বাবা?

হ্যাঁ। ভেবে দেখলাম ঘরে বসে না থেকে ওখানে যোগ দেই। দেখিনা স্কুলটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি কিনা। আব্বার আত্মপ্রত্যয়ী চেহারা দেখে আমাদের সবার মনটা খুশিতে ভরে গেল। আব্বা আনোয়ারা স্কুল থেকে চলে আসার পর আম্মার মনটা সব সময় খারাপ থাকত। আমরা ভাই বোনেরা ছোট হলেও অনুভব করতাম কেমন জানি অস্বস্থির মধ্যে আমাদের দিনগুলো অতিবাহিত হচ্ছে।

পরের দিন তিনটার দিকে দেখি দৌলতপুর স্কুলের সেই স্যারটা এসেছেন সাথে আরো দুইজন লোক। আমি বাবাকে ডেকে দিলাম। আমাদের কাচারি ঘরে বসে ওনারা বাবার সাথে কথা বলছেন। কিছুক্ষণ পর আম্মা চা নাস্তা তৈরি করলে আমি গিয়ে কাচারি ঘরে তা রেখে আসলাম। নতুন লোক দুইজন আব্বাকে জিজ্ঞেস  করলেন আমি কে?

”আমার বড় ছেলে” আব্বা বললেন

আমি সালাম দিতেই একজন জিজ্ঞেস করলেন ”কি নাম তোমার”?

টিপু,

কোন ক্লাসে পড়?

ক্লাস ফাইভে।

ভালভাবে পড়। ফাইভ পাশ করে আমাদের স্কুলে সিক্সে ভর্তি হবে। কি বলেন স্যার।

আব্বা মৃদু হেসে বল্লেন, হ্যাঁ।

আমি চলে আসলাম। আব্বার সাথে আরো কিছুক্ষণ আলাপ করে ওনারাও চলে গেলেন। আব্বা ঘরে এসে মাকে বললেন, তিনি আগামীকাল দৌলতপুর স্কুলে জয়েন করবেন। মা শুনে খুশি হলেন। আমরাও সবাই খুশি হলাম।

পরের দিন সকালে বাবা নামাজ পড়ে হাঁটতে গেলেন। আব্বার একটা অভ্যাস ছিল ভোরে উঠে নামাজ পড়ে হাটতেন,সময় পেলে আমাদের চাষের জমিগুলো দেখে আসতেন। বাড়ীতে এসে নিজ হাতে ডাব কেটে খেতেন।

নতুন স্কুলে যাবেন তাই আম্মা তাড়াতাড়ি উঠে আব্বার জন্য ভাত রান্না করলেন। আব্বা গোসল সেরে এসে ভাত খেয়ে কাপড় পরে রেডি হলেন। ৯টার সময় রিক্সা আসল আব্বাকে নিতে। আশির দশকে যোগাযোগ ব্যবস্থা এত ভাল ছিল না। রিক্সাই ছিল সহজ যোগাযোগ বাহন। সেদিন রাত ১১টায় আব্বা বাড়ীতে ফিরলেন। দেরী হচ্ছে দেখে আমাদের সবার খুব টেনশন হচ্ছিল। আব্বা আসার পর সবাই টেনশনমুক্ত হলাম। নতুন স্কুল সম্পর্কে জানার জন্য সবাই কৌতুহলী দৃষ্টিতে আব্বার দিকে তাকালাম। আব্বা হেসে উঠে বললেন-সব দেখে মনে হল একজন লোককে হাত পা বেঁধে নদীতে সাতার কাটতে দিলে যে অবস্থা হবে আমারও ঠিক সেই অবস্থা হবে। মজার ব্যাপার হল স্কুলে একটা ঘড়ি পর্যন্ত নেই। মোজাফফর সাহেব (শিক্ষক) ঘড়ি দেখে সময় বললে দপ্তরী ঘন্টা বাজায়।

পরদিন থেকে আব্বার ব্যস্ত সময় পার হতে লাগল। রাত ১০/১১ টার আগে আব্বা বাড়ীতে আসতেন না। অল্প দিনের মধ্যে আব্বা দৌলতপুর স্কুলের আমূল পরিবর্তন সাধন করেন। ম্যানেজিং কমিটি পূনর্গঠন, নতুন শিক্ষক নিয়োগ করে সবার মধ্যে নব উদ্যম সৃষ্টি করে লেখাপড়ায় গতি সঞ্চালন ঘটালেন। ফল পেতেও সময় লাগেনি। ১৯৮২ সালে দৌলতপুর স্কুলের ছাত্র আবু ইউছুফ কুমিল্লা বোর্ড হতে মেধা তালিকায় স্থান পেলেন, পটিয়া উপজেলার দৌলতপুর স্কুল চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলেন, আর তার নেপথ্য কারিগর আব্বার নাম আনোয়ারার গন্ডি পেরিয়ে পটিয়া তথা দক্ষিণ চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়ল।

আব্বার দৌলতপুর স্কুলে যোগদানের ছয় মাস পরে আমিও আব্বার সাথে স্কুল হোস্টেলে চলে আসি। দৌলতপুর স্কুল লাগোয়া মতিউর রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণীতে ভর্তি হই। আমি আর আব্বা হোস্টেলের এক রুমে থাকতাম। স্কুলের দপ্তরী এখলাস বদ্দা আমাদের ভাত রান্না করে দিতেন। ১০/১৫ দিন পর পর আমি বাড়িতে এসে চাল নিয়ে যেতাম। সাথে আম্মা গরুর মাংস রান্না করে দিতেন। আমাদের অনেক আত্মীয়ের ছেলেকে আব্বা দৌলতপুর স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাশ করিয়েছেন। পরীক্ষায় সাফল্যের দিক থেকে দৌলতপুর স্কুল পটিয়া উপজেলায় শীর্ষস্থানীয় বিদ্যালয়ে স্থান করে নিয়েছিল।  শিক্ষার প্রতি আব্বার প্রবল আগ্রহ এবং নিষ্ঠা ছিল। প্রাইমারীর গন্ডি পেরিয়ে আমি দৌলতপুর স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হই। আব্বাকে দেখতাম দশটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে শিক্ষকরা  কে কেমন পড়াচ্ছেন তা তদারকি করতেন। পাশাপাশি তিনিও প্রতিদিন ৩/৪টা ক্লাস নিতেন। তাছাড়া কোন শিক্ষক ছুটিতে থাকলে তাঁর ক্লাসও আব্বা নিতেন। যে কোন বিষয়ে পড়াতে তিনি ছিলেন বেশ সাবলীল। যে সব ছাত্ররা অংক এবং ইংরেজীতে দুর্বল আব্বা তাদেরকে স্কুল ছুটির পর আলাদা করে বিনা পারিশ্রমিকে পড়াতেন। যারা আর্থিকভাবে দুর্বল তাদেরকে বেতন / ফি মওকুফ করে দিতেন। আমি দেখেছি অনেক সময় আব্বা নিজের পকেটের টাকা দিয়ে গরীব ছেলে মেয়েদের বই খাতা কিনে দিতে।

তখন রবিবার স্কুল বন্ধ থাকত। আব্বাকে দেখতাম ফজরের নামাজ পড়ে বাড়ী থেকে বের হয়ে যেতেন। ধানের জমি ঘুরে গ্রামের যেসব ঘরে ছেলেমেয়ে স্কুলে পড়ে তাদের বাড়ীতে বাড়ীতে গিয়ে তাদের লেখাপড়ার খবরাখবর নিতেন। কোন অংক না পারলে তা বুঝিয়ে দিতেন। সারা গ্রাম ঘুরে ১১/১২টার সময় বাড়ীতে আসতেন। তারপর আমাদের নিয়ে বসতেন। কলা গাছের পাতার উপর বাঁশের কঞ্চি দিয়ে কলম বানিয়ে আমাদেরকে প্রথম অ, আ, ক, খ লেখা শেখাতেন। আব্বা বলতেন এতে নাকি লেখা সুন্দর হয়। পরবর্তীতে স্লেট পেন্সিল কিনে দিতেন। আমাদের সময়ে ক্লাস থ্রিতে উঠলে কলম কিনে দিত। তখন হিরো কালি দিয়ে টিটুনি কলমে লেখা ছোটদের খুব গর্বের ব্যাপার ছিল। আবার কারো সাথে মারামারি লাগলে প্রতিপক্ষের শার্টে কলম ঝেড়ে কালি ছিটিয়ে দেওয়াও ছিল ছোটদের বাহাদুরি ব্যাপার।

বন্ধের দিন আব্বা বাড়ীতে থাকা মানে আম্মার কষ্ট বেড়ে যাওয়া। গ্রামের বয়স্ক, আব্বার সমসাময়িক অনেকে দেখা করতে আসতেন। আব্বা ওনাদেরকে নিয়ে  কাছারী ঘরে বসতেন। কারো ছেলে লেখাপড়া করছে না, কেউ ক্লাস নাইনে উঠেছে কোন গ্রুপ নিয়ে পড়বে কিংবা কেউ টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করেছে কি করবে ইত্যাদি সমস্যার সমাধান খুঁজতেন আব্বার কাছে। আব্বা সবাইকে সুপরামর্শ দিতেন। যারা লেখাপড়ায় বেশ দুর্বল বার বার পরীক্ষা দিয়েও ম্যাট্রিক পাশ করতে পারছে না আব্বা তাদেরকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য তাদের বাবা মাকে পরামর্শ দিতেন। সারাদিন কাছারি ঘরে বসে আব্বা মানুষকে পরামর্শ কিংবা নানা বিষয়ে গল্পে মগ্ন থাকতেন আর কিছুক্ষণ পর পর আম্মার কাছে ফরমায়েশ পাঠাতেন চা-বিস্কুট, পান দেওয়ার জন্য।

লেখাপড়ার ব্যাপারে আব্বা ছিলেন বেশ আন্তরিক এবং আপোষহীন। স্কুলে কোন ছাত্র/ছাত্রী পরপর কয়েকদিন না আসলে আব্বা তাদের মা বাবার কাছে খবর পাঠাতেন ছেলে/মেয়ে স্কুলে আসছেনা কেন তা জানার জন্য। আনোয়ারা স্কুলে থাকাকালীন সময়ে আব্বা মাঝে মাঝে বাড়ীতে আসতেন না। অফিসিয়াল কাজ জমে গেলে তা শেষ করে রাতে হোটেলে খেয়ে স্কুলের দোতলায় একটা রুমে থাকতেন। আমিও আব্বার সাথে দু-একবার আনোয়ারা স্কুলের হোস্টেলে ছিলাম। একদিনের ঘটনা। আব্বা অফিসে বাস কাজ করছিলেন। পাশের চেয়ারে বসে আমি ইত্তেফাক পত্রিকা পড়ছিলাম। সময়  বিকেল ৫/৬ টা মত হবে। দেখি একজন লোক আব্বাকে সালাম দিয়ে রুমে ঢুকলেন। আব্বা কুশল বিনিময় করে জানতে চাইলেন ওনার আগমনের হেতু। লোকটি বললেন, ওনার ছেলে গত ৩/৪ দিন ধরে স্কুলে যাচ্ছে বলে বাড়ী থেকে বের হয় কিন্তু স্কুলে না এসে কোথায় যেন চলে যায়। রাতে ঠিকমত লেখাপড়া করে না। ছেলে কোথায় জিজ্ঞাসা করলে লোকটি বলেন বাইরে আছে। আব্বা দপ্তরী অমূল্যকে দিয়ে ছেলেটিকে পাশের রুমে বসতে খবর পাঠায় এবং দুইটা বেত আনতে বলে। দপ্তরী বেত নিয়ে আসলে আব্বা পাশের রুমে গিয়ে ঐ ছেলেটিকে বেশ মারলেন। পরদিন থেকে নিয়মিত স্কুলে আসবে এবং ছুটির পর আব্বার সাথে প্রতিদিন দেখা করে যাবে এই ওয়াদা করার পর শাস্তি বন্ধ করলেন। বাপ ছেলে বিদায় নিলেন। আব্বার চেহারা দিকে তাকালাম। দেখি রাগে আব্বার চেহারা লাল হয়ে গেছে। সিগারেট ধরিয়ে জোরে জোরে টানছেন। কোন কিছু নিয়ে টেনশন বা চিন্তা করলে আব্বা ঘন ঘন সিগারেট খেতেন। মাঝে মাঝে দেখতাম চেইন স্মোকারদের মত আব্বা একটা সিগারেট শেষ হলে ওটার আগুন থেকে আরেকটি সিগারেট জ্বালিয়ে খেতেন। আব্বার প্রিয় ব্রান্ড ছিল স্টার সিগারেট।

কথায় বলে “ঢেঁকি মক্কায় গেলেও নাকি ধান ভাঙ্গে।” আব্বা নানার বাড়ীতে যাওয়া মানে আমার মামা খালাদের জন্য বাড়ীতে যম হাজির হওযার মত অবস্থা। রাতে আব্বা মামা খালাদের পড়াতেন বসতেন। পড়াতে বসলে আব্বার কোন সময়জ্ঞান থাকত না। ঘড়িতে যতই বাজুক আব্বার পাঠদান শেষ হতনা। তাই আব্বাকে দেখলে মামা খালারা বেশ নাখোশ হতেন।

আমাদের জন্য বেশ বিরক্তিকর বিষয় ছিল আব্বার সাথে কোথাও বেড়াতে যাওয়া। কারণ আব্বাকে রাস্তায় যেই দেখে সালাম দিয়ে কথা বলা শুরু করে দেয়। যদি ছাত্র হয় তো আব্বা তার লেখাপড়া নিয়ে আলোচনা করে আর গার্ডিয়ান হলে ওনার ছেলে/মেয়ের লেখাপড়া কেমন হচ্ছে তার খোঁজ খবর নেন। একজন কথা বলতে বলতে আরো ২/৩ জন এসে যোগ দেন। এদিকে আমরা অপেক্ষা করতে করতে মহাবিরক্ত, সেদিকে আব্বার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। ছাত্র/ছাত্রীরা আব্বাকে দেখার সাথে সাথে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতেন। আবার এমন অনেকে আছেন যারা ১৫/২০ বছর আগে ছাত্রজীবন শেষ করেছেন। তারাও দেখা হলে আব্বাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতেন। বর্তমানে স্বার্থের জন্য ছাত্র -শিক্ষক দলবাজি করে, ছাত্ররা শিক্ষকদের অসম্মান করে। ধরে নিয়ে পুকুরে ফেলে দেয় সেখানে ৭০/৮০ দশকে শিক্ষকদের প্রতি ছাত্র/ছাত্রীদের কিংবা তাদের অভিভাবকদের সম্মান প্রদর্শন ছিল অতুলনীয়। তখনকার সময়ে শিক্ষকদের জ্ঞান ছিল, সম্মান ছিল কিন্তু পকেটে টাকা ছিল না। বর্তমানে শিক্ষকদের পকেট ভর্তি টাকা আছে কিন্তু সম্মান / শ্রদ্ধা নেই। চেয়ার দখল করার জন্য কিংবা চেয়ার ঠিক রাখার জন্য তারা ছাত্রদের ব্যবহার করে। জ্ঞান অর্জন করে প্রকৃত মানুষ হওয়ার পরিবর্তে সার্টিফিকেট অর্জন করাই বর্তমান যুগে লেখাপড়ার মূখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষাকে পণ্য হিসাবে ব্যবহার করে শিক্ষকরা টাকা উপার্জনের কারিগর হয়ে উঠেছেন। ফলে দেশে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেলেও জাতির কপালে শিক্ষিত নামধারী বিবেকহীন, অমানুষ, বর্বর ও স্বার্থপর জনগোষ্ঠি যোগ হচ্ছে প্রতিবছর!

আব্বা শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে যেমন সমাজকে আলোকিত করেছেন তেমনি দেশমাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।  স্বনামধন্য সাংবাদিক,গবেষক জনাব জামাল উদ্দীন রচিত গ্রন্থ “মুক্তিযুদ্ধে আনোয়ারা”থেকে জানা যায় ১৯৭১ সালে আব্বা আনোয়ারা স্কুলের ছাত্রদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য সংগঠিত করেছিলেন। দপ্তরী অমূল্যকে দিয়ে কাপড় কিনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা বানিয়ে আনোয়ারা স্কুলে নিজ হতে উত্তোলন করেন। এ খবর পেয়ে আনোয়ারা থানা থেকে পুলিশ এসে আব্বার সাথে ঝামেলা করেন। এরপর থেকে আব্বা বাড়ীতে আত্মগোপন করেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আনোয়ারা থানার কুখ্যাত রাজাকার কমান্ডার জালাল আব্বাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ধরে নিয়ে যায়। ভাগ্যক্রমে আব্বা সেযাত্রায় জীবন রক্ষা পায়।

আব্বা বিশ্বাস করতেন গ্রামের উন্নয়ন মানে দেশ তথা বাংলাদেশের উন্নয়ন। তাই আমাদের গ্রাম শিলাইগড়ার উন্নয়নের চিন্তা আব্বার মানসপটে দৃঢ়ভাবে স্থান পেয়েছিল। আমাদের গ্রামের ছেলে মেয়েদের পাঠভ্যাস গড়ে উঠার জন্য একটা পাঠাগারের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করেন। সেই অনুভবকে বাস্তবায়িত করার জন্য শুরু করেন পরিকল্পনা। এলাকায় তরুণ সমাজকে একত্রিত করেন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মিটিং করেন আমাদের কাছারি ঘরে। সিদ্ধান্ত হয় নজিরার টেকে একটি পাঠাগার স্থাপন করা হবে। পাঠাগার করার জন্য চাই একটা বিশাল রুম। কি করা যায়? নজিরার টেকে  রাস্তার পার্শ্বে রাজা মিয়া চাচার (ম্যজিস্ট্রেট জনাব রফিক আহমদ ) একটা জমি আছে। আব্বা রাজা মিয়া চাচাকে তার জমি থেকে ২ গন্ডা জমি পাঠাগারের জন্য দান করতে অনুরোধ করেন। পরবর্তীতে আব্বার অনুরোধে চাচা পাঠাগারের জন্য জমি দিতে সম্মত হলেন। এবার তোড়জোর শুরু হল ভবন নির্মাণের জন্য। সবার সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হল ‘শিলাইগড়া গণ পাঠাগার।” আব্বা আমাদের পড়ার টেবিলটা পাঠাগারে দান করলেন। আব্বার অনুরোধে আব্বার অনেক প্রাক্তন ছাত্র পাঠাগারে বই ও শিক্ষা সরঞ্জাম দান করলেন। পাঠাগারকে ঘিরে আমাদের গ্রামে এক নবজাগরণ সৃষ্টি হয়। জ্ঞান পিপাসু ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষিত মানুষের অংশগ্রহণে পাঠাগার জমজমাট থাকত। কেউ বই,কেউ পত্রিকা পাঠে নিমগ্ন থাকত।

পাঠাগারের পর আব্বা গ্রামে বিদ্যুত আনার প্রক্রিয়া শুরু করেন।এ নিয়ে পাঠাগারে অনেক সময় আমাদের কাছারী ঘরে মিটিং হত। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সাথে আব্বা নিয়মিত দেখা করতেন। সরকারি সিদ্ধান্তের ধীর গতির কারণে তা বাস্তবায়নে অনেক সময় লেগে যায়। আব্বার দুর্ভাগ্য যে, আমাদের গ্রামে রাতের বেলায় বৈদ্যুতিক আলোর বন্যা দেখে যেতে পারেননি।

মানবিকতা ও মহানুভবতার দিক থেকে আব্বার অবস্থান ছিল অনেক উপরে। ৭০/৮০ দশকে শিক্ষকতা এমন একটা পেশা ছিল সেখানে একজন শিক্ষক শুধু সমাজের সবার সম্মান পেতেন। আর্থিক মানদন্ডে শিক্ষকদের অবস্থান তেমন শক্ত ছিল না। সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের আর্থিক অবস্থান মোটামুটি সহনীয় হলেও বেসরকারি স্কুলের অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। শিক্ষাদানকে মহান ব্রত হিসেবে না নিলে এবং পারিবারিকভাবে আর্থিক অবস্থা শক্ত না হলে শিক্ষক হিসেবে টিকে থাকা খুবই কষ্টকর ছিল। কারণ বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকদের বেতন সবসময় নিয়মিত ছিলনা । আমার চাচা ও দাদীর কাছে শুনেছি একবার ঈদের আগে সরকারি কোষাগার থেকে আনোয়ারা স্কুলের শিক্ষকদের বেতন আসতে দেরী হচ্ছিল। ঈদ আনন্দ মাটি হয়ে যাবে এই আশংকায় সব শিক্ষক এসে নাকি আব্বাকে করুণ সুরে আবেদন করেন কিছু একটা ব্যবস্থা করার জন্য। আব্বা শিক্ষকদের করুণ মুখের চাহনি সহ্য করতে না পেরে বাড়ীতে এসে দুইটি হালের বলদ বিক্রি করে দেন এবং সেই টাকা সব শিক্ষক ও কর্মচারীদের মধ্যে ভাগ করে দেন।

প্রধান শিক্ষক হিসাবে আব্বাকে স্কুলের দাপ্তরিক কাজে প্রায় সময়  কুমিল্লা বোর্ডে যেতে হত। তাছাড়া আব্বা কুমিল্লা বোর্ডের অংক বিষয়ে পরীক্ষক ছিলেন। ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষে হলে এক গাদা খাতা নিয়ে কুমিল্লা থেকে ফিরতেন আব্বা। এক মাসের মধ্যে সব খাতা মূল্যায়ন করে তা ফেরত দিতে হত। আব্বা কুমিল্লা যাওয়া মানে আমাদের রসনা তৃপ্তির মহা উপলক্ষ। কুমিল্লা থেকে ফেরার পথে আব্বা আমাদের জন্য দুহাত ভর্তি করে রস মালাই, সাগরকলা, মৌসুমী আম, লিচু নিয়ে আসতেন। আমরা সবাই মিলে তৃপ্তি ভরে তা খেতাম। আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে আব্বা আমাদের সবাইকে শহরে খালার বাসায় বেড়াতে নিয়ে যেতেন। তখন মধ্যবিত্ত সমাজের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল সিনেমা হলে গিয়ে সপরিবারে সিনেমা দেখা। খালার বাসায় গেলে আব্বা আমাদের সবাইকে সিনেমা হলে নিয়ে সিনেমা দেখাতেন। তখনকার গুলজার হলে আমরা বেশ কয়েকবার সিনেমা দেখেছি। ২/৩ বার আমি আব্বার সাথে লায়ন ও জলসা সিনেমা হলেও সিনেমা দেখেছি। একবার আব্বার সাথে শহরে গেলে আব্বা আমাকে সেই সময়ের হিট সিনেমা ‘সবুজ সাথী’ দেখাতে নিয়ে যায়। সিনেমা হলে বসে আমি নায়ক নায়িকা শাবানা জসিম এর উপর তাদের সৎ মায়ের অত্যাচার দেখে কান্না করলে আব্বা আমাকে শান্তনা দিয়ে বলেন, কান্না করিও না। দেখবে ওরা বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। সৎমা তার ভুল বুঝতে পারবে বলে আমাকে শান্তনা দিতে লাগলেন। সিনেমার শেষ দৃশ্যে নায়ক নায়িকার সাফল্যে আমি বেশ খুশি হলাম। সিনেমা শেষে আব্বা হোটেলে এসে আমাকে বুঝালেন- কষ্ট করলে, ঠিকমত লেখাপড়া করলে সিনেমার নায়ক নায়িকাদের মত সবার জীবনে সাফল্য আসে।  আব্বা আমাকে বললেন, ’সিনেমা হলো বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি,বাস্তব কাহিনী নিয়ে সিনেমার গল্প তৈরী করা হয়’।

 

স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে উদ্ধুদ্ধ করার ব্যাপারে আব্বা সচেতন ছিলেন। দৌলতপুর স্কুলে প্রতিবছর বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হত। আব্বার উৎসাহ ও অনুুপ্রেরণায় আমি বার্ষিক ক্রীড়া, বিতর্ক ও নাটকে অংশ নিতাম। বিতর্ক প্রতিযোগিতার জন্য আব্বা আমাকে পয়েন্ট লিখে দিতেন। আব্বার অনুপ্রেরণা আমার মনজগতে সাহিত্য ও সাংস্কৃতির প্রতি এমন আগ্রহী করে তুলেছিল যে,পরবর্তীতে পটিয়া রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয় এবং পটিয়া কলেজে আমি সাহিত্য প্রতিযোগিতায় অনেক পুরস্কার পেয়েছি।

 

আব্বার মৃত্যুর দিনটি আমি কখনো ভুলতে পারব না। ১৯৮৪ সালের ১৮ই ডিসেম্বর মঙ্গলবার। বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষার পর আব্বা শিক্ষকদের নিয়ে মিটিং করলেন। মিটিং শেষে ৫টার দিকে দুপুরের ভাত খেলেন। পরের দিন আমার কৃষি বিজ্ঞান পরীক্ষা। আমি তখন ক্লাশ এইটে পড়ি। রুমে বসে আমি পড়ছি। অফিসে কাজ সেরে ৭টার দিকে আব্বা রুমে আসলেন। বিছানায় শুয়ে পড়লেন। ৪/৫ মিনিট পর উঠে মশারি টানালেন। আবার শুয়ে পড়লেন। দেখি একটু একটু কাঁশছেন। আমাদের পাশের রুমে পরিমল স্যার থাকতেন। তিনি পদার্থ বিদ্যায় মাস্টার্স পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আব্বার কাঁশির আওয়াজ শুনে আমাকে বললেন, ’টিপু স্যারকে একটু লবণ দিয়ে গরম পানি দাও, ভাল লাগবে’। আমি ইলেকট্রিক হিটারে আব্বার জন্য গরম পানি করলাম। আব্বার কাঁশি বাড়তে লাগল। দেখি আব্বা বিছানা থেকে উঠলেন। আমাকে বললেন, ’হারিকেনটা জ্বালাও বাথরুমে যাব’। আমি হারিকেন জ্বালিয়ে আব্বাকে বাথরুমে নিলাম। বাথরুম সেরে আব্বা পুকুরে ওজু করলেন। রুমে এসে আবার শুয়ে পড়লেন। ২/৩ মিনিট পরে উঠে বসলেন। কাঁশি আরও একটু বাড়ল, ড্রয়ার খুলে সিগারেটের প্যাকেটটা হাতে নিলেন। তারপর দুহাত নিয়ে ভিতরে সিগারেসটসহ প্যাকেটটা দুই টুকরা করে আজ থেকে আর সিগারেট খাব না বলে জানালা দিয়ে ছুড়ে মারলেন। এক মিনিট পর আব্বা বসা থেকে বিছানায় পড়ে গেলেন। শব্দ শুনে পরিমল স্যার দৌঁড়ে আসলেন। আমি আর পরিমল স্যার আব্বাকে বিছানার উপর ধরে বসালাম। পরিমল স্যার আব্বার বুকে সরিষার তেল মালিশ করতে লাগলেন। এমন সময় আমাদের রান্না করার জন্য এখলাস বদ্দা (দপ্তরী) আসলেন। পরিমল স্যার এখলাস বদ্দাকে বললেন, ’এখলাস বাজারে গিয়ে তাড়াতাড়ি একজন ডাক্তার নিয়ে এস’। আমি বললাম স্যার আমি যায়। আব্বা বললেন, ’না তুমি যেও না’। তুমি আমার পার্শ্বে থাক। অনেকক্ষণ পর এখলাস বদ্দা ডাক্তার (সম্ভবত এলএমএফ) নিয়ে আসলেন। তিনি আব্বার পালস্ দেখে বললেন, ’ওনাকে শুয়ে দাও’। তারপর একটা গ্লাসে পানি নিয়ে চামচ দিয়ে আমাকে বললেন ২ চামচ পানি খাইয়ে দাও। আমি ২ চামচ পানি দিলাম। মনে হল আব্বা পানি খেয়েছেন। ডাক্তার বললেন-ওনি মারা গেছেন। আমি যেন বোবা হয়ে গেলাম। চেষ্টা করেও আমার গলা দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে না। কিন্তু দুই চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়তে লাগল। মুহূর্তের মধ্যে হেড মাস্টার মারা গেছেন -এ কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে দৌলতপুর স্কুলের মাঠে ছাত্র অভিভাবকের ভীড় জমে গেল। সবাই সিদ্ধান্ত নিল রাতেই আব্বাকে আমাদের বাড়ী শিলাইগড়ায় নিয়ে যাবেন। আমাকে সবাই শান্তনা দিতে লাগলেন। রাত ১২টার দিকে আমরা সবাই আব্বার লাশ নিয়ে বাড়ীর উদ্দেশ্যে  হাঁটা দিলাম। সম্ভবত রাত ৩/৪ টার দিকে আব্বার লাশ নিয়ে বাড়ীতে পৌঁছলাম। বাড়ীতে এসে দেখলাম সে এক অভাবনীয় দৃশ্য। ঘরে আম্মা, ভাই, বোন ,দাদী, চাচা সবাই কান্না করছে। উঠানে গ্রামের লোকেরা কান্না করছে। ১৯ ডিসেম্বর ১৯৮৪ সকালে মাইকে প্রচার করা হল আব্বার মৃত্যু সংবাদ। তখনকার সময়ে মোবাইল ফোন ছিল না। তাই সবাইকে সংবাদ পৌছানো সম্ভব না হলেও শুনে শুনে কয়েক হাজার লোক জানাজায় অংশ নেন। অন্য ধর্মাবলম্বীর কয়েকশ লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে তাঁদের শেষ শ্রদ্ধা জানালেন। ফুলে ফুলে আব্বার লাশবাহী খাট ভরে উঠেছিল। নামাজ শেষে আব্বাকে আমার দাদা মরহুম আবদুল হাকিমের পাশে কবরে শুয়ে দেওয়া হল। বড় ছেলে হিসাবে সবাই আমাকে ডাকলেন কবরে মাটি দেওয়ার জন্য। একবুক কষ্ট বুকে চেপে আব্বার কবরে তিন মুঠো মাঠি দিলাম।

কবর দেওয়া শেষ হলো । তারপর সবাই জটলা পাকিয়ে আলাপ করছেন। যেদিকে যায় কানে আসছে একটা কথা ”মাস্টার বেহেস্তী, জানাজায় এত লোক সে কথায় প্রমাণ করে। ওনিতো কোন অন্যায় করেনি। সারাজীবন মানুষের উপকার করেছেন বেহেস্ত তো অবধারিত” ইত্যাদি নানা কথা।

 

আব্বা সারা জীবন মানুষের ছেলে মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করে গেছেন। অথচ দুর্ভাগ্য যে নিজের ছেলে মেয়েকে মানুষ করার সময়ে অকুল সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে তিনি ওপারে চলে গেছেন। অকালে বাবা হারানোর কষ্ট তখন না বুঝলেও পরবর্তীতে প্রতিটি মুহূর্তে আমরা চার ভাই, দুই বোন অনুভব করেছি আব্বার অভাব। আব্বা বেঁচে থাকলে হয়ত আমাদের জীবন অন্য রকম হতে পারত।

আমি একটি বেসরকারী ব্যাংকে কর্মরত। গ্রাহক সেবা দিতে গিয়ে আমাকে অনেক লোকের সাথে প্রতিদিন কথা বলতে হয়। এ রকম কথা বলতে গিয়ে আব্বার ছাত্র কিংবা আব্বাকে চিনতো  এ রকম ২/১ জনের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ মাঝে মধ্যে হয়। আমি আবদুল  মোতালেব মাস্টারের ছেলে এই পরিচয় পাওয়ার পর তাঁরা আব্বা সম্পর্কে যেভাবে প্রশংসা করেন তা শুনে আমার  সত্যি গর্ব হয়,আমার চোখে ভাসে আমার আব্বার প্রিয়মুখটি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমার  আব্বার সকল গুনাহ মাফ করে দিন। কেয়ামত পর্যন্ত ওনার কবরের আজাব মাফ করে বেহেশতের সুখ শান্তি দান করুন,আমিন। যারা এ লেখা পড়বেন তাদের প্রতিও আব্বার নাজাতের জন্য দোয়া করার অনুরোধ করছি

সর্বশেষ