১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রচ্ছদঅনুরণনপ্রথম পতাকা উড়ানোর গল্প

প্রথম পতাকা উড়ানোর গল্প

একাত্তরের ২ মার্চে ছাত্রদের পক্ষে পতাকাটি উত্তোলন করেছিলেন তৎকালীন ডাকসুর ভিপি আ স ম আব্দুর রব। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, পতাকা উত্তোলনের ঘটনা মুক্তিকামী ছাত্র-জনতাকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে প্রচণ্ডভাবে আন্দোলিত করেছিল। আ স ম রব জানিয়েছেন, সেদিন সমাবেশ ছিল বটতলায়। কিন্তু বটতলায় পতাকা উড়ালে সবাই দেখবে না বলে তারা কলাভবনের দক্ষিণ-পশ্চিমের বাড়ির বারান্দার ছাদ থেকে সেটি উত্তোলন করেছিলেন।

পতাকা ওড়াতে আ স ম আব্দুর রব ছাড়াও ডাকসুর তৎকালীন জিএস আব্দুল কুদ্দুস মাখন, ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ কলাভবনের দোতলায় উঠেন। সেখান থেকে রেলিং টপকে তারা বাড়ির বারান্দার ছাদে অবস্থান নিয়েছিলেন।

এর মধ্যে বেলা ১১টার দিকে ছাত্রলীগের তখনকার ঢাকা নগর শাখার সভাপতি শেখ জাহিদ হোসেনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের ২০-২৫ জনের একটি দল একটি ফ্লাগমাস্টের মাথায় পতাকাটি বেঁধে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে জহুরুল হক হল থেকে বটতলার জনসমুদ্রের দিকে আসতে থাকে।

তখন গগনবিদারী স্লোগানে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ পুরো এলাকা কাঁপছিল এবং অসংখ্য মানুষের মধ্য দিয়ে স্লোগান দিতে দিতে পতাকাসহ ছাত্ররা কলাভবনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সেখান থেকেই পতাকাটি হাতে নিয়ে অপরাপর ছাত্রনেতাদের সাথে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক পতাকা উড়ান আ স ম আব্দুর রব।

সেই অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে আব্দুর রব বলেছেন, ‘পতাকা উত্তোলন স্বায়ত্তশাসন বা দ্বিজাতি তত্ত্বকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছিল। তখন শুধু একটি পথই খোলা ছিল, স্বাধীনতা। মানুষের মনে এ ধারনার জন্ম দেয় যে, পতাকা হচ্ছে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক সত্তা। বাঙালির স্বপ্ন পূরণের বয়ান হচ্ছে এই পতাকা।’

পতাকাটি কারা বানিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের গবেষক এম এ হাসান বলছেন, পতাকাটি তৈরি হয়েছিল আগেই, যার পেছনে ছিল তৎকালীন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্ররা। এই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ পরবর্তীতে হয়েছিল বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বা বুয়েট।

এম এ হাসান বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী ছাত্ররা ২ মার্চে হল থেকে পতাকাটি এনে উত্তোলন করেছিল।

অধ্যাপক এ কে এম শাহনেওয়াজ বলেছেন, একটা নিউক্লিয়াস আগেই গঠিত হয়েছিল সিরাজুল আলম খান, কাজী আরেফ আহমেদ, শিবনারায়ণসহ একদল ছাত্রকে নিয়ে। তারাই পতাকা তৈরি ও উত্তোলনের কাজটি করেছিলেন। আর ওই পতাকা স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রের প্রস্তাব করেছিলেন কাজী আরেফ আহমেদ। আর স্কেচ করেছিলেন হাসানুল হক ইনু।

আ স ম আব্দুর রব বলেন, নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তৈরি করা হয়েছিল ১৯৭০ সালের ৬ জুন সন্ধ্যায়। তখনকার ইকবাল হলের ১১৬ নম্বর রুমে। সেই রাতেই পতাকা তৈরির বিষয়টি শেখ মুজিবুর রহমানকে অবহিত করে তার সম্মতি আদায় করেন আব্দুর রাজ্জাক।

তখনকার ছাত্রনেতা মনিরুল ইসলাম, শাহজাহান সিরাজ ও আ স ম আব্দুর রবকে ডেকে নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্ত মতো পতাকা তৈরির কথা জানান কাজী আরেফ আহমেদ। আব্দুর রব আরও বলেন, কাজী আরেফ আহমেদ, শিব নারায়ণ দাসসহ ২২ জন পতাকা তৈরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

১৯৭০ সালের ৬ জুন পতাকাটি তৈরির পরদিন ৭ জুন পল্টন ময়দানে তখনকার ছাত্রনেতাদের গঠিত ‘জয় বাংলা বাহিনী’ আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে সেটি তুলে দেন।

বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান পতাকাটি গ্রহণ করে তার সাথে থাকা তার জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের হাতে দিলে তিনি নগর ছাত্রলীগের নেতা শেখ জাহিদের হোসেনের হাতে তুলে দেন। জাহিদ হোসেন পরে সেটিই একাত্তরের ২ মার্চে হল থেকে কলাভবনের সামনে নিয়ে আসেন উত্তোলনের জন্য।

এর পর দিন ৩ মার্চে স্বাধীনতা ইশতেহার পাঠেরও সময় ছাত্র নেতৃবৃন্দ স্বাধীন বাংলাদেশের এই পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। অবশ্য বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে পতাকা থেকে মানচিত্র বাদ দিয়ে কামরুল হাসানের ডিজাইনে করা লাল সবুজের পতাকাটিই বাংলাদেশের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়।

পতাকা আগেই তৈরি হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা- ‘ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি’র আহ্বায়ক ড. এম এ হাসান বলেছেন, ২ মার্চের পতাকা উত্তোলনের পর সারাদেশে বিভিন্ন জায়গায় বাংলাদেশের পতাকা উড়তে শুরু করে। এমনকি ২৩ মার্চে পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে পুরো পূর্ব পাকিস্তানে ক্যান্টনমেন্ট গভর্নর হাউজ ছাড়া সব জায়গায় বাংলাদেশের পতাকাই উড়ানো হয়েছিল। পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়েই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এটি দেখেই সবাই বার্তা পায় যে, অচিরেই স্বাধীন দেশ পাব আমরা।’

‘মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ হাজার বছরের উত্তরাধিকার’ বইয়ের লেখক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম শাহনেওয়াজ বলছেন, পতাকা উত্তোলনের উদ্যোগটা ছিল ছাত্রদের। তারা আগে থেকে এটি তৈরি করেছে, যা পরে শেখ মুজিবুর রহমানকে দেয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সবচেয়ে উত্তাল দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয় একাত্তরের মার্চ মাসকেই। এ মাসের শুরুতেই স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠের পর ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ মূলত একটি অনিবার্য যুদ্ধের দিকেই নিয়ে যাচ্ছিল জাতিকে। শেষ পর্যন্ত সেই যুদ্ধ শুরু হলো একাত্তরের ২৫ মার্চে পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ঢাকায় নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ শুরুর মধ্য দিয়েই।

ফলশ্রুতিতে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান এবং শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের ৯ মাসব্যাপী স্বাধীনতার লড়াই।

পতাকা উত্তোলনের সাথে জড়িত তখনকার ছাত্র নেতারা ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষকরা বলছেন, ’৭০ সালের নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে পাকিস্তানি নেতাদের টালবাহানা শুরুর পর তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে যে তুমুল ক্ষোভ বিক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, সেটিকে আরও অনেকদূর এগিয়ে নিয়েছিল কলাভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের ঘটনা। সূত্র: বিবিসি

সর্বশেষ