কে না জানে! কোন আলোকবর্তিকা নিয়ে প্রতিবছর আসে পচিঁশে বৈশাখ। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে (৭ মে, ১৮৬১) কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মেছিলেন বাঙালির প্রাণপুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাঙালির শত-সহস্র বছরে জন্মেছে একজনই, তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷ আজ তার ১৬২তম জন্মবার্ষিকী ।
মূলত কবির চল্লিশ বছর বয়স থেকেই ভক্ত ও আপনজনের উৎসাহে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালন শুরু হয়। কবি নিজেও তার বিভিন্ন জন্মজয়ন্তীতে ভক্তদের উদ্দেশে অনেক কথা বলেছেন,কবিতা লিখেছেন।
১৩১৭ সালে বোলপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সংবর্ধনায় কবি প্রথম নিজের জন্মদিনের ভাষণে বলেছিলেন, “কতো পঁচিশে বৈশাখ চলে গিয়েছে, তারা অন্য তারিখের চেয়ে নিজেকে কিছুমাত্র বড়ো করে আমার কাছে প্রকাশ করেনি।”
আজ পঁচিশে বৈশাখ, রবির ১৬২তম জন্মজয়ন্তী
৫০তম জন্মদিবসে কবি নিজেকে আলোক প্রভায় প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আজ আমার জন্মদিনে তোমরা যে উৎসব পালন করছো তার মধ্যে যদি সেই কথাটি থাকে তোমরা যদি আমাকে আপন করে পেয়ে থাকো আজ প্রভাতে সেই পাওয়ার আনন্দকেই যদি তোমাদের প্রকাশ করবার ইচ্ছে হয়ে থাকে তাহলেই এই উৎসব সার্থক। আমার এই পঞ্চাশ বৎসর বয়সেও আমাকে তোমরা নতুনভাবে পেয়েছ, আমার সঙ্গে তোমাদের সম্বন্ধের মধ্যে জরাজীর্ণতার লেশমাত্র লৰণ নেই। তাই আজ সকালে তোমাদের আনন্দ উৎসবের মাঝখানে বসে আমার এই নবজন্মের নবীনতা অনন্তের বাইরে উপলব্ধি করছি।”
কবির ৫৯তম জন্মজয়ন্তী পালন করা হয় শান্তিনিকেতন আশ্রমে। পঁচিশে বৈশাখের আগের দিন অথ্যাৎ ২৪শে বৈশাখ তিনি রচনা করেছিলেন, ‘আমার জীর্ণ পাতা যাবার বেলায়’।
ছিলেন বাবা -মায়ের কনিষ্ঠ পুত্র। রবীন্দ্রনাথের বাবার নাম দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মায়ের নাম সারদা দেবী। দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন সমাজ সংস্কারক ,রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্মের প্রধান সংগঠক। তাঁর অনুগামীরা তাঁকে মহর্ষি বলে ডাকতেন।
আজ পঁচিশে বৈশাখ, রবির ১৫৭তম জন্মজয়ন্তী
জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি সাহিত্য চর্চার কেন্দ্র ছিল ।চার বছর বয়সের সময় থেকে রবির বিদ্যা শিক্ষা শুরু হয়, শৈশবেই উৎসরিত হয় তার মেধা ও বুদ্ধির শিখা। ছোটবেলা থেকেই কবিতা পড়তে খুব ভাল লাগতো, ”জল পড়ে পাতা নড়ে”এ কথাটি লিখেই তার কবিতা লেখার হাতেখড়ি। তিনি বাংলা ভাষায় বহু কবিতা,গান,নাটক,উপন্যাস,প্রবন্ধ ইত্যাদি রচনা করে থাকেন।
১৮৭৪ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-এ তাঁর “অভিলাষ” কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা। ১৮৮৩ সালে মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা কালক্রমে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ নেয়।১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ (গীতাঞ্জলী) লিখে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি শুধু ভারতের কবি নন ,সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবি বলে খ্যাতি লাভ করেন।
নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তার পুরস্কারের অর্থ তিনি এই পরগনার প্রজাদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার জন্য ৭৫ হাজার টাকা তৎকালীন সময়ে এখানে স্থাপিত কৃষিব্যাংকের মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন। এই প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকার প্রজাদের মাঝে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে কবি ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে পতিসরে এসে তার পুত্র রথীন্দ্রনাথের নামে কালিগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন স্থাপন করেন এবং এই প্রতিষ্ঠানের নামে ২শ বিঘা জমি দান করেন। অন্তত এটুকু নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন মহান ও উদার মনের মানুষ। এই পরগনাসহ দেশের জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য ছিল অপরিমেয় ভালোবাসা। এই ভূখণ্ডের ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আমৃত্য লড়েছেন তিনি।
রবীন্দ্রনাথ মূলত কবি। প্রকাশিত মৌলিক কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৫২। তবে বাঙালি সমাজে তাঁর জনপ্রিয়তা প্রধানত সংগীতস্রষ্টা হিসেবে। রবীন্দ্রনাথ প্রায় দুই হাজার গান লিখেছিলেন। কবিতা ও গান ছাড়াও তিনি ১৩টি উপন্যাস, ৯৫টি ছোটগল্প, ৩৬টি প্রবন্ধ ও গদ্যগ্রন্থ এবং ৩৮টি নাটক রচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র রচনা রবীন্দ্র রচনাবলী নামে ৩২ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া তাঁর সামগ্রিক চিঠিপত্র উনিশ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রবর্তিত নৃত্যশৈলী “রবীন্দ্রনৃত্য” নামে পরিচিত।
১৯৪১ সালে জোড়াসাঁকোর বাসভবনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিশ্বকবি। জীবনের শেষ অনুভূতি প্রকাশেও তিনি ছিলেন কালান্তরের কবি। তবে কি জানতেন?
প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্ত্বার নতুন
আবির্ভাবে
কে তুমি?
মেলেনি উত্তর।
বৎসর বৎসর চলে গেল।
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল
পশ্চিম সাগর তীরে
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়-
কে তুমি?
পেলনা উত্তর।
রবীন্দ্রনাথের ১৬২তম জন্মজয়ন্তী পালনের জন্য প্রস্তুত কবির আত্রাইয়ের পতিসরের কাচারি বাড়ি। প্রতিবারের মতো এবারও কবিগুরুর নিজস্ব জমিদারি তাঁর স্মৃতি বিজড়িত নওগাঁর পতিসর কাচারি বাড়ি প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয়েছে দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের।


