১৯৯৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নকালেই আমার পত্র-পত্রিকায় লেখা-লেখি শুরু। সায়েম নামে এক বন্ধুর বাড়ি ছিল সিলেটের জকিগঞ্জে। সে প্রায়ই তার গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার নিমন্ত্রণ করে বলতো, তার সাথে বেড়াতে গেলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তরেখা নির্ধারণকারী কুশিয়ারা নদীর পাশে তার নানার বাড়িতে নিয়ে যাবে, যে বাড়ির ছাদে বসে ভারতের করিমগঞ্জের জনজীবন পর্যবেক্ষণ করা যায়। সে বলতো, তুমি যেহেতু আন্তর্জাতিক বিষয়াদি নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখি করো সেহেতু তোমার সাথে বৃটিশ ভারতের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ কর্মকর্তার দায়িত্বপালনকারী নানার সাথে জমবে ভালো। আরো বলতো, অনেক রাজনৈতিক উত্তান-পতনের সাক্ষী নানা বেশ রসিক এবং প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। তাঁর এসব কথা শোনে ভারতের জীবনযাত্রা স্বচক্ষে দেখার খুব কৌতূহল সৃষ্টি হলো। কারণ, তখনো আমার দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশ তো দূরের কথা, কোনদেশের সীমান্তসংলগ্ন এলাকাও দেখার সুযোগ হয়নি।

১৯৯৬ সালের দিকে প্রায় সপ্তাখানিকের জন্য সায়েমের বাড়িতে বেড়াতে যাই, সাথে নানার বাড়িতেও। তার নানার আতিথেয়তার স্মৃতি কখনো ভুলবার নয়। বিকেল বেলা দু’তলা বাড়ির ছাদে উঠে কুশিয়ারা নদীর ওপারে ভারত অংশের জীবনযাত্রা সবকিছুই স্পষ্ট দেখে রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম। বারবার ইচ্ছা জাগছিল, ইস্ একটু করে হলেও যদি বিদেশের মাটিতে পা রাখতে পারতাম। সায়েমের নানা সেদিন দেশবিভাগের যে চমকপ্রদ গল্প শুনিয়েছিলেন তা স্মৃতিতে এখনো দেদীপ্যমান। এবার শোনা যাক, প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তদানীন্তন পুলিশ কর্মকর্তা নুর উদ্দিন মুন্সির সেইদিনের গল্পের ছলে বাস্তব ইতিহাসঃ-
“১৯০৫ সালে ব্রিটিশরা বঙ্গভঙ্গ করে বাংলাকে ভাগ করার সময় তুলনামূলক অনুন্নত আসামের প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বাংলা থেকে সিলেটকে কেটে আসামের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়। শিক্ষায়-সম্পদে সিলেট তখন অগ্রসর ছিল। আসামের সচিবালয়ের প্রাণশক্তি ছিলেন সিলেটীরা।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় আসাম পড়ে ভারতের ভাগে। সমস্যা দেখা দেয় সিলেটকে নিয়ে। একে তো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, তদুপরি সিলেট ইতিপূর্বে পূর্বে বাংলারই অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। সবশেষে সিলেট কার সঙ্গে যাবে—এ প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে সিলেটের জনগণ রায় দেন, তারা পাকিস্তানের সঙ্গেই যাবে। এভাবে সিলেট আবার ফিরে এল বাংলায়। তবে সম্পূর্ণ এল না, অঙ্গহানি ঘটল। সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ ছাড়াও সিলেটের আরেকটি মহকুমা ‘করিমগঞ্জ’-কে রেখে দেওয়া হয় ভারতে। ভারত- পাকিস্তানের সীমানা নির্ধারণের জন্য বৃটিশ সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত র্যাডক্লিপ কমিশন ঐ অঞ্চলে দুই দেশের সীমানা নির্ধারণ করে কুশিয়ারা নদীর মধ্য স্রোত। স্রোতস্বিনী কুশিয়ারা নদীর এপারে জকিগঞ্জ, ওপারে করিমগঞ্জ। সে হিসেবে করিমগঞ্জ ভারতের অংশের মধ্যে পড়ে। গণভোটের ভিত্তিতে সিলেট কার সাথে যাবে সেটা ইতিমধ্যে ফয়সালা হওয়ায় সিলেটের মহকুমা করিমগঞ্জকে ভারতের অংশে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত করিমগঞ্জের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলামানরা কিছুতেই মানতে রাজি ছিলেননা।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান ও ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। ওই সময় এমএ হক করিমগঞ্জ মহকুমার এসডিপিও (মহকুমা পুলিশ কর্মকর্তা) ছিলেন। তিনি (নুর উদ্দিন মুন্সি) ছিলেন এমএ হকের অধীন করিমগঞ্জের ‘রাতাবাড়ি’ থানার সিও। (পূর্ব পাকিস্তানে ডিআইজি হিসেবে জনাব এমএ হকের ব্যাপক পরিচিতি ছিল। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের ভূমিমন্ত্রী (১৯৮৪-৮৫) ছিলেন। তাঁর বাড়ি ও সংসদীয় এলাকা ছিল জকিগঞ্জ। তাঁর মেয়ে ফারহানা হক বাংলাদেশ টেলিভিশনের একসময়ে জনপ্রিয় ইংরেজি সংবাদ পাঠিকা ছিলেন)। বাংলার সাহসী সন্তান এমএ হক ১৪ আগস্ট করিমগঞ্জ মহকুমা পুলিশ কার্যালয়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন এবং সিলেটে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ঘন ঘন তারবার্তা পাঠাতে থাকেন সামরিক সাহায্য পাঠানোর জন্য। নানা বললেন, প্রতিদিন আমরা অপেক্ষায় থাকি, এই এল বুঝি ফোর্স। না, আসে না। এভাবে একদিন/দু’দিন করে সাত দিন কেটে গেল। এদিকে ভারতীয় বাহিনী চলে এল করিমগঞ্জ শহরে। আমরা তখন নিরুপায়। আর কিইবা করতে পারি। মহকুমা পুলিশ কার্যালয় থেকে পাকিস্তানের পতাকাটা নামিয়ে গুটিয়ে নিয়ে এমএ হকের নেতৃত্বে চলে আমরা এলাম এপারে অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানে। এভাবেই অবসান ঘটল করিমগঞ্জ অধ্যায়ের”।
করিমগঞ্জ, রাতাবাড়ি, পাথারকান্দিসহ সিলেটের সাড়ে তিনটি থানা রয়ে গেল ভারতে, যার বর্তমান আয়তন মৌলভীবাজার জেলার সমান। ওই সময় সিলেট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কেন সাড়া দেননি বা দিতে পারেননি—তা জানতে চাইলে নানা ক্ষোভের সাথে বলেছিলেন, “পূর্ব বাংলার তদানীন্তন রাজনীতিবিদদের অদক্ষতা এবং পশ্চিম পাকিস্তানী নেতৃবৃন্দের অবহেলায় শুধু করিমগঞ্জ নয়, পশ্চিম দিনাজপুর, ২৪ পরগনা, মালদাহ, মুর্শিদাবাদ জেলার মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা পূর্ববাংলার হাতছাড়া হয়ে যায়, নতুবা আজকের বাংলাদেশের আয়তন আরো একতৃতীয়াংশ বড় হতো”। স্মর্তব্য, হিন্দু-মুসলিম সংখ্যাধিক্যের বিচারে মূলতঃ ভারত-পাকিস্তান বিভক্ত হয়েছিল।
নানা নুর উদ্দিন মুন্সির সেদিনের একটি কথা এখনো হৃদয়ে দাগ কাটে। তিনি বলেছিলেন, “মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ আর লিয়াকত আলী খানরা পাঞ্জাবের নিয়ন্ত্রণ পেতে মরিয়া ছিলেন, বাংলা নিয়ে ভাববার সময়ই তো ছিলনা! তাঁরা পূর্ব বাংলাকে মনে করতো বেনিফিট টেরিটোরি। পাকিস্তান আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব যেহেতু পশ্চিম পাকিস্তানীদের হাতে ছিল, সেহেতু তাদের হস্তক্ষেপ কিংবা সহযোগিতা ছাড়া শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, এম এ হাশিম প্রমুখ নেতৃবৃন্দের বেশি কিছু করার ছিলনা”।
নুর উদ্দিন মুন্সির কাছে সেদিন সিলেটের অবিচ্ছেদ্য অংশ করিমগঞ্জ হারানোর কাহিনী শোনার পর করিমগঞ্জ নামটি আমার হৃদয়ে বেদনা-বিদূর হয়ে গেঁথে আছে অদ্যাবধি। দীর্ঘ ২৬/২৭ বৎসর পর আজকের এই কাহিনীর অবতারণার কারণ ২০১৯ সালের কুরবানীর ঈদের পরদিন সেই করিমগঞ্জ দেখার সুযোগ। ঐ বছর ৯ রমজান থেকে ১৭ রমজান পর্যন্ত চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে এক আত্মীয়ের সাথে ভারতের ব্যাঙ্গালুরে ছিলাম। নারায়ণা হসপিটালের স্প্রাস রোডের মাঝামাঝি যে গেস্টহাউজে ছিলাম তার ম্যানেজারের বাড়ি ছিল আসামের করিমগঞ্জে। রুম বুকিং দেওয়ার সময় বাংলাদেশী পাসপোর্ট দেখে আকবর আলী নামীয় পঁচিশোর্ধ এই ম্যানেজার খাঁটি সিলেটি ভাষায় কথোপকথন শুরু করে দেয়। প্রথম দিন থেকেই তার সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে। তিনজনে মিলে গেস্টহাউজটি পরিচালনা করে। তাদের নজর থাকে বাংলাদেশী রোগী ও আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি। সে নিয়মিত রোজা রাখতো, অনেকবার একসাথে ইফতার করেছি। ২৫ বৎসর পূর্ব থেকে বিশেষ কৌতুহল থাকায় তার কাছে বারবার জানতে চাইতাম করিমগঞ্জের বর্তমান হালহাকিকত। করিমগঞ্জ জকিগঞ্জের মতো একসময় সিলেটের অন্তর্ভূক্ত ছিল- এ রকম টুকটাক ধারণা ছাড়া পূর্বাপর ঘটনাবলী সম্পর্কে তেমন কিছু জানা ছিলনা আকবর আলীর। আমার কাছে করিমগঞ্জের ইতিহাস শোনে সে রীতিমতো আমার ভক্ত হয়ে পড়ে এবং বারবার আবদার করতে থাকে তার দেশের বাড়ি করিমগঞ্জ বেড়াতে যেতে। বলতো, ব্যাঙ্গালুর থেকে কলকাতা-আসাম গোয়াহাটি হয়ে করিমগঞ্জ পৌঁছতে প্রায় ৩৬ ঘন্টা লাগে। এদিকে আমারও করিমগঞ্জ দর্শনের স্বাদ সেই ১৯৯৬ সাল থেকেই। তাকে কথা দিলাম, তুমি বাড়িতে বেড়াতে গেলে যাবার চেষ্টা করবো। গত কুরবানের সপ্তাখানিক পূর্বে আকবর আলী ফোন দিয়ে জানালো, সে কুরবানীর ঈদ গ্রামের বাড়িতে করবে এবং আমাকেও একসাথে তার সাথে ঈদ করার আমন্ত্রণ জানালো। আমার কথা নাকি তার মা-বাবাকেও বলেছে এবং তাঁরা শোনে খুব খুশি হয়েছেন। জকিগঞ্জ দিয়ে করিমগঞ্জ যাওয়ার সুযোগ না থাকায় গত কুরবানীর ঈদের পরদিন চট্টগ্রাম থেকে কিশোরগঞ্জগামী ট্রেনে চড়ে আখাউড়া স্টেশনে নেমে বিকেল তিনটায় ত্রিপুরা সীমান্ত দিয়ে আগরতলায় পৌঁছি। আকবর আলী কিছুক্ষণ পরপর খবর নিচ্ছিলো। ঐদিন আগরতলা ঘুরাঘুরি শেষে পরদিন সকাল ১০ টার ট্রেনে আগরতলা জংশন হতে সোজা করিমগঞ্জ জংশন। দুপুর দেড়টায় ট্রেন থেকে নামতেই আকবর আলী! আমি তো পুরা অবাক। সে তার সাত/আট বছরের ভাতিজি রেহনুমাকে নিয়ে দীর্ঘ দুই ঘন্টাধরে আমার অপেক্ষায়। পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরলো। স্টেশন থেকে বের হয়ে ছোট জেলা শহর করিমগঞ্জ থেকে টেক্সি করে মাত্র পৌণে এক ঘন্টার মধ্যেই তার বাড়িতে। তাঁর বয়স্ক মা-বাবা দু’জনই বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। একজন বাংলাদেশীর আগমনে গোটা পরিবারে বিশেষ কৌতুহল দেখলাম। চট্টগ্রামের বৃহত্তম কাপড়ের বাজার টেরিবাজার থেকে আকবর আলীর মায়ের জন্য ভালো মানের সূতির শাড়ি আর বাবার জন্য নিয়েছিলাম ‘বাবা লুঙ্গি’ ঈদ উপহার হিসেবে। সামান্য উপহারেই বাজিমাত! ঠান্ডা পানীয়জল ও হাল্কা নাস্তা শেষে দুপুরের খাবার। নানা পদের খাবার আর আতিথেয়তা দেখে মনে হলো না আমি বিদেশের মাটিতে।খাবার শেষে আকবর আলীর বাবা আর বড় ভাইয়ের সাথে শুরু হয় নানা বিষয়ে কথোপকথন, বিশেষ করে বাংলাদেশ নিয়ে। পরদিন সকালে আকবর আলীর বাড়ি থেকে ১৫/১৬ কিলোমিটার দূরে কুশিয়ারা নদী দেখতে গিয়েছিলাম। ২৬/২৭ পূর্বে বাংলাদেশের জকিগঞ্জ থেকে দেখা স্রোতস্বিনী কুশিয়ারা নদীকে ভারতের করিমগঞ্জ থেকে দেখতে এসে বড্ড অচেনা লাগছিল। বারবার মনে পড়ছিল, সায়েমের নানা বাড়ি ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর তার নানার কথা। সায়েমের সাথে এখন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। তাই তাদের খবর নেওয়ারও কোন সুযোগ নেই। যাই হোক, পরদিন সকালে আকবর আলীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আগরতলায় ফিরে এসে বিকেলে আগরতলার রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা ও পুরাকীর্তি দর্শন করি এবং তারপরদিন সকালে আখাউড়া সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করি।
লেখক পরিচিতিঃ অধ্যাপক শাব্বির আহমদ
কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।
shabbiraff@gmail.com
01819392985


