
নিজস্ব প্রতিবেদক
নগরীতে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বেড়েই চলছে। আকস্মিক হর্নের শব্দ একজন মানুষকে বধির কিংবা বেহুঁশ করে দিতে পারে। অথচ এই অপরাধের নামমাত্র জরিমানার বিধান থাকলেও তা প্রয়োগ নেই। এছাড়া ট্রাফিক পুলিশের কাছে শব্দ পরিমাপের কোনো যন্ত্র না থাকায় তারাও বুঝতে পারেন না কোন গাড়ি কত মাত্রায় হর্ন বাজাচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দ দূষণ যেকোনো মানুষের জন্য ক্ষতিকর হলেও এতে শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া গর্ভবতী মা’দের জন্য এই শব্দ দূষণ বেশ হুমকি স্বরুপ। এছাড়াও ট্রাফিক পুলিশ, রিক্সা বা গাড়ি চালক, রাস্তার নিকটস্থ শ্রমিক বা বসবাসকারী মানুষ অধিক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের শ্রবণ সীমার স্বাভাবিক মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল। যার বেশি হলে শব্দ দূষণে পরিণত হয় যা থেকে মানুষের শরীরে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়। শব্দ দূষণের ফলে মানুষের শ্রবণ ক্লান্তি এবং বধিরতা পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া যে সকল রোগ হতে পারে তার মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, কণ্ঠনালীর প্রদাহ, আলসার, মস্তিস্কের রোগ, কাজ করার ক্ষমতা হ্রাস, বদমেজাজ বা খিটখিটে মেজাজ, ক্রোধ প্রবণতা, স্নায়ুবিক দুর্বলতা, রক্তনালীর সংকোচন এবং হার্টের সমস্যা অন্যতম।
শ্রবণের সহনীয় মাত্রা ৫০ থেকে ৬০ ডেসিবল হলেও চট্টগ্রাম মহানগরের ২৮ পয়েন্টে শব্দের সীমা ৮০ থেকে ১০০ ডেসিবল পর্যন্ত পাওয়া গেছে। যার ফলে স্থানের একটিতেও শব্দের মাত্রা সহনীয় মাত্রায় পাননি গবেষকরা। এ মাত্রা রেকর্ড করা হয় প্রধান সড়ক, বাস টার্মিনাল, আবাসিক এলাকা, স্কুল-কলেজ ও হাসপাতাল এলাকা থেকে । বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দের পরিমাপ ৫০ থেকে ৬০ ডেসিবলের চেয়ে বেশি হলেই তা মানুষের শ্রবণশক্তিকে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়। এতে বয়স্কদের তুলনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। মাত্রাতিরিক্ত এ শব্দদূষণ রোধ করতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, হাইড্রলিক হর্ন ব্যবহারে সতর্কতা ও সরবরাহ বন্ধ করাসহ বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন গবেষকরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৬০ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ মানুষকে অস্থায়ী বধির এবং ১০০ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ মানুষকে স্থায়ী ভাবে বধির করে দেয়। অথচ চট্টগ্রাম শহরে শব্দের মাত্রা ধারণা করা হয় ৬০-৯০ ডেসিবেল যা মানুষকে বধির করে দিতে পারে। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপে জানা যায়, চট্টগ্রামে যানবাহনের শব্দের পরিমাণ ৯৩.৭ ডেসিবেল, কল-কারখানায় ৮০-৯০ ডেসিবেল, সিনেমা হল ও রেস্তোঁরাতে ৭৫-৯০ ডেসিবেল, যেকোন অনুষ্ঠানে ৮৫-৯০ ডেসিবেল, মোটর বাইকে ৮৭-৯২ ডেসিবেল, বাস এবং ট্রাকে ৯২-৯৪ ডেসিবেল যার সবকটিই মানুষের মস্তিকের বিকৃতি এবং জটিল সব রোগ সৃষ্টি করে। বিশেষদের মতে জানা যায়, শয়ন কক্ষে ২৫ ডেসিবেল, ডাইনিং এবং ড্রয়িং কক্ষের জন্য ৪০ ডেসিবেল, অফিসের জন্য ৩৫-৪০ ডেসিবেল, শ্রেণিকক্ষের জন্য ৩০-৪০ ডেসিবেল, লাইব্রেরির জন্য ৩৫-৪০ ডেসিবেল, হাসপাতালের জন্য ২০-৩৫ ডেসিবেল এবং সর্বোপরি ৪৫ ডেসিবেলের বেশি হওয়া উচিৎ নয়। অথচ নগরীতে সৃষ্ট শব্দের সীমা স্বাভাবিক সর্বোচ্চ সীমার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ডিজিটাল সাউন্ড লেভেল মিটারে ধারণকরা পরীক্ষাগারের গত কয়েকমাসের রিপোর্টে দেখা যায় চট্টগ্রাম শহরের শব্দ দূষণের সার্বিক পরিস্থিতি অসহনীয় পর্যায়ে আছে। নগরের ২৮ টি স্থানে শব্দের পরিমাপ নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি পাওয়া গেছে। শব্দের এমন মাত্রা মানুষের শ্রবণ শক্তিকে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়। আর এ সমস্যা সমাধানে সবার সম্মিলিত পরামর্শ ও মতামতের মাধ্যমে উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে অনেকের স্বাস্থ্যহানি ঘটবে। এ ক্ষেত্রে বেশি ক্ষতি গ্রস্থ হবে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা।
এ ব্যাপারে ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শব্দ দূষণের ফলে তারা বিভিন্ন সমস্যায় পড়ছেন বিশেষ শরানাপন্ন হচ্ছে। হঠাৎ করে হর্ন বাজানোর ফলে অনেকেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাদের মতে, শব্দ দূষণ সমস্যার জন্য নামমাত্র যে শাস্তি বা জরিমাণার বিধান আছে তা দিয়ে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রথমত নামমাত্র শাস্তি বা জরিমানা, দ্বিতীয়ত সে আইনের বিন্দুমাত্র প্রয়োগও নেই বললেই চলে। তাদের মতে, প্রয়োগহীন এই আইন শব্দ দূষণকারীদের অতিরিক্ত শব্দ দূষণে আরো উৎসাহ যোগাচ্ছে। তারা মনে করেন, শব্দ দূষণ রোধে দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়িয়ে শব্দ দূষণ রোধ করা সম্ভব। ফলে নেই একজন নাগরিকের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার। উচ্চমাত্রার শব্দের মধ্যে বাস করতে করতে মানুষের স্বভাবও খিটখিটে হয়ে যায়, এ নিয়ে অনেক সময় পরিবারিক বিপর্যয়ও নেমে আসে। শব্দদূষণের প্রভাবে অনেক লোক জোরে জোরে কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। মনে করে, শব্দের কারণে অন্য লোকটি তার কথা শুনতে পারছে না। সাধারণ শব্দকে মাপা হয় ডেসিবেল বা ডিবিতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডঐঙ এর মতে- বসতি এলাকায় দিনের বেলা ৫৫ ডিবি রাতে ৪৫ ডিবি হওয়া উচিত। বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৬৫ ডিবি, রাতে ৫৫ ডিবি, শিল্পাঞ্চলে দিনে ৭৫ ডিবি, রাতে ৬৫ ডিবির মধ্যে শব্দমাত্রা থাকা উচিত। আর হাসপাতাল ইত্যাদি সাইলেন্স জোন বা নীরব এলাকায় দিনে ৫০ রাতে ৪০ ডিবি শব্দমাত্রা থাকা উচিত। অর্থাৎ এই মাত্রার মধ্যে থাকা আমাদের পক্ষেসহনীয়। এর বেশি হলেই দূষণ হিসেবে তা চিহ্নিত হয়। আমাদের দেশে এই শব্দমাত্রা নিয়ে খুব বেশি মাথা-ব্যথাও নেই। আসলে, সহনীয় মাত্রার অতিরিক্ত শব্দ যদি আমরা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বা অনেকক্ষণ ধরে শুনতে বাধ্য হই, তাহলে সেই শব্দের দূষণ ও অন্যান্য পরিবেশ দূষণের মতো মারাত্মক হয়ে উঠে। আমাদের শরীর ও মনের মাঝে দূষণ যে তীব্র প্রভাব ফেলে এই ঘটনাগুলিই তার সাক্ষ্য বহন করে।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগের পরীক্ষাগর থেকে সর্বশেষ (২২ ও ২৪ জুলাই ২০১৮ এবং ২৭ ও ২৯ আগস্ট ২০১৮) প্রাপ্ততথ্য মতে প্রধান সড়কে দূষণ মাত্রা শব্দের সহনীয় মাত্রা হিসেবে ৬০ ডেসিবল পর্যন্ত থাকার কথা। কিন্তু কাপ্তাই রাস্তার মাথায় সর্বোচ্চ ১০১ ডেসিবল পর্যন্ত শব্দের অতিরিক্ত মাত্রা পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও নিউ মার্কেটে ৯০ দশমিক ৭ ডেসিবল, মুরাদপুরে ৯০ দশমিক ২ ডেসিবল, বন্দর এলাকায় ৯৪ দশমিক ৩ ডেসিবল, একে খান এলাকায় ৮২ ডেসিবল, জিইসি সার্কেলে ৯৩ দশমিক ৭ ডেসিবল, চকবাজারে ৮৯ দশমিক ৪ ডেসিবল, দেওয়ানহাটে ৮৯ দশমিক ৩ ডেসিবল, বহদ্দারহাটে ৭৮ দশমিক ৬ ডেসিবল, ২ নম্বর গেটে ৮৮ ডেসিবল, আন্দরকিল্লায় ৮৭ দশমিক ৩ ডেসিবল এবং আগ্রাবাদ এলাকায় ৮৪ ডেসিবল পর্যন্ত শব্দের মাত্রা পাওয়া গেছে।
আবাসিক এলাকায় দূষণ
আবাসিক এলাকায় শব্দের সহনীয় মাত্রা ৫৫ ডেসিবল থাকার কথা থাকলেও সেখানে চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় সর্বোচ্চ ৭১ ডেসিবল, আমিরবাগ আবাসিক এলাকায় ৭১ দশমিক ২ ডেসিবল,কল্পলোক আবাসিক এলাকায় ৭২ দশমিক ৬ ডেসিবল,হিলভিউ আবাসিক এলাকায় ৬৫ দশমিক ৯ ডেসিবল, কসমোপলিটন আবাসিক এলাকায় ৬৮ দশমিক ৫ ডেসিবল, দক্ষিণ খুলশী আবাসিক এলাকায় ৭৮ দশমিক ২ ডেসিবল, হালিশহর কে ব্লক আবাসিক এলাকায় ৭৪ দশমিক ৯ ডেসিবল,পর্যন্ত শব্দের মাত্রা পাওয়া গেছে।
হাসপাতাল এলাকায় দূষণ চিত্র
হাসপাতাল এলাকায় সহনীয় পর্যায় হিসেবে ৫০ ডেসিবল পর্যন্ত শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করা হলেও সেখানে নগরীর মেহেদীবাগ ম্যাক্স হাসপাতালে সামনে ৭৭ দশমিক ৯ ডেসিবল, আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে ৭০ দশমিক ৬ ডেসিবল ,চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭১ ডেসিবল, ইউএসটিসির সামনে ৭৯ ডেসিবল, আন্দরকিল্লা জেমিসন রেড় ক্রিসেন্ট হাসপাতালের সামনে ৬৯ ডেসিবল, এক খান আল আমিন হাসপাতালের সামনে ৮১ ডেসিবল দশমিক ২, মুরাদপুর একুশে হাসপাতালের সামনে ৭২ ডেসিবল , পূর্ব নাসিরাবাদ সাউদার্ন হাসপাতেলর সামনে ৭৩ দশমিক ৭ ডেসিবল, লালখান বাজার মমতা ক্লিনিকের সামনে ৭২ দশমিক ৭ ডেসিবল.পাচঁলাইল সার্জিস্কোপ হাসপাতালের সামনে ৭১ দশমিক ৪৮১ ডেসিবল, পর্যন্ত শব্দের মাত্রা পাওয়া গেছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে দূষণ চিত্র
মহানগরীর স্কুল ও কলেজ এলাকায় শব্দের সহনীয় মাত্রা হিসেবে ৫০ ডেসিবল থাকার কথা থাকলেও সেখানে নগরীর ওয়াসা মোড়ের বাংলাদেশ মহিলা সমিতি বালিকা বিদ্যালয় এলাকায় পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ৭৯ দশমিক ৯ ডেসিবল। একইভাবে চট্টগ্রাম কলেজ এলাকায় ৭৭ দশমিক ১ ডেসিবল, সিটি কলেজ এলাকায় ৭৭ ডেসিবল, সরকারি খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয়ে ৭৩ দশমিক ৭ ডেসিবল, ইস্পাহানী পাবলিক স্কুল ও কলেজের সামনে ৭৩ দশমিক ১ ডেসিবল, পাহাড়তলী মহিলা উচ্চ বিদ্যালয় সামনে ৬৭ ডেসিবল এবং সরকারী মহিলা উচ্চ বিদ্যালয় এলাকায় পাওয়া গেছে ৬১ ডেসিবল শব্দমাত্রা।
এভাবেই চট্টগ্রামসহ দেশজুড়ে বিয়ে বা গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানসহ নানা সামাজিক-রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে মাইকে গান বাজানো যেন একটা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আর রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নেতার জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকী বা বিশেষ দিবসগুলোতে সারাদিন-রাত ধরে উচ্চ শব্দে মাইক বাজালেও কেউ তার প্রতিবাদ করার সাহস পান না। আর শীতকাল এলেই এলাকায় এলাকায় ওয়াজ মাহফিল, কোথাও আবার কীর্তন চলে। এসব মাহফিল বা কীর্তনে একাধিক মাইক বাজানো হয় উচ্চ শব্দে। ফলে শব্দ দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ফলে দেশজুড়েই শব্দ দূষণ এক নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। শব্দ দূষণ এখন জীবনবিনাশী শব্দ সন্ত্রাস। আইন থাকলেও তার প্রয়োগ নেই এর বিরুদ্ধে।
তাই দূষণ কমাতে উচিত পরিবেশ অধিদপ্তরের সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়ানো, শব্দদূষণ প্রবণ এলাকা চিহ্নিত ও ব্যবস্থা গ্রহণ, সিটি করপোরেশনকে উদ্যোগী হয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ, ট্রাফিক ব্যবস্থার উম্নয়ন, চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, সচেতনতার জন্য গণমাধ্যমে শব্দদূষণ নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শব্দদূষণ প্রতিরোধ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অবহিতকরণসহ সচেতনমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। আর হাসপাতাল সাইলেন্স জোন বা নীরব এলাকায় দিনে ৫০, রাতে ৪০ ডেসিবেল শব্দ মাত্রা থাকা উচিত।সেই সাথে যথাযথ শাস্তি প্রয়োগকরা একান্ত জরুরী।


