৭ ও ৮ জুন ২০২৫—এই দুইদিন শুধুই ক্যালেন্ডারে কিছু তারিখ নয়, বরং আমাদের হৃদয়ের পাতায় লেখা হয়ে রইলো এক গর্বিত স্মৃতি, এক অনন্য সাংস্কৃতিক জাগরণের দিন।
ফ্রান্সের শান্ত, নান্দনিক শহর Moret-sur-Loing-এর ঐতিহাসিক Salle Roland Dagnaud মিলনায়তনে আয়োজিত হলো এক শিল্পভিত্তিক সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ—চিত্রপ্রদর্শনী “Lullabies of the Hill”, যার ক্যানভাসে রঙ হয়ে ফুটে উঠেছিল পাহাড়ের নিঃশব্দ কথন, মাটির গন্ধ, শেকড়ের টান, এবং আমাদের জাতিসত্তার না-বলা কথাগুলো।
এই প্রদর্শনী আমাদের শিল্পী তুফান চাকমা’র আত্মায় গড়া এক অনন্য শিল্পভাষ্য। তাঁর তুলিতে ফুটে ওঠা প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি রঙ যেন আমাদের জাতিসত্তার প্রতিচ্ছবি। আমি একজন জুম্ম আদিবাসী হিসেবে বলতে পারি—এটা কেবল একটি শিল্প প্রদর্শনী ছিল না, এটা ছিল আমাদের অস্তিত্বের নীরব অথচ দৃপ্ত উচ্চারণ। এটা ছিল এক নান্দনিক প্রতিবাদ, এক দৃশ্যমান স্বপ্ন, এক জাগরণ যার মাধ্যমে আমাদের পাহাড়, আমাদের যন্ত্রণা, আমাদের সংস্কৃতি ছুঁয়ে গেলো আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকে।
প্রদর্শনীর প্রতিটি চিত্র যেন পাহাড়ের বুক চিরে উঠে আসা একেকটি গল্প—কখনও ঘুমপাড়ানির সুরে মিশে থাকা কোনো মায়ের ব্যথা, কখনও উচ্ছ্বসিত শিশুর চোখে দেখা স্বাধীনতার স্বপ্ন, আবার কখনওবা পরাধীনতার নিঃশব্দ ক্ষতচিহ্ন। তুফান চাকমার তুলিতে শুধু রঙ নয়, ছিল ব্যথা, আশ্রয়হীনতা, প্রতিবাদ আর ভালোবাসা। তিনি যেন পাহাড়ের গল্পগুলো বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে দিয়ে বলছিলেন “আমরাও মানুষ, আমরাও গল্পের অধিকার রাখি।”এ আয়োজনকে আরও মহিমান্বিত করেছে শ্রদ্ধেয় রানী ইয়েন ইয়েন-এর উপস্থিতি। তিনি শুধু একজন সাংস্কৃতিক নেত্রী নন, বরং আমাদের অধিকারের প্রতীক, আমাদের ইতিহাসের জীবন্ত কণ্ঠ। রানীমার পাশে দাঁড়িয়ে যখন আমরা তাঁর স্নেহময় ভাষণ শুনেছি, তখন হৃদয়ের গভীর থেকে উপলব্ধি করেছি—আমাদের কণ্ঠস্বর কেউ শুনছে, আমাদের ব্যথা কেউ আঁকছে।
তাঁর উপস্থিতি ছিল এক নীরব অথচ দৃঢ় বার্তা—পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি কোনো লুপ্তপ্রায় চিহ্ন নয়, বরং তা আজও বেঁচে আছে সাহসে, গানে, ক্যানভাসে, এবং হৃদয়ে।
এই চিত্রপ্রদর্শনী শুধু একটি সাংস্কৃতিক ইভেন্ট নয়, এটা ছিল এক অভিজ্ঞতা। ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে থাকা জুম্ম প্রবাসীরা এখানে এসে যেন ফিরে পেয়েছিলেন নিজেদের মাটি, নিজেদের ভাষা, নিজেদের শেকড়। কারও চোখে জল, কারও মুখে হাঁসি, কারও হাতে রান্না করা পাহাড়ি খাবার—সব মিলিয়ে যেন Moret-sur-Loing হয়ে উঠেছিল এক টুকরো বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, বা রাঙামাটি।
এই দুই দিন আমরা সবাই যেন একে অপরের গল্পে বেঁচে ছিলাম। নিজেদের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম সেই শৈশবে, সেই পাহাড়ি গন্ধে, সেই চিংথুর বাজনায়। আমরা আবারও বুঝেছি—ভৌগোলিক দূরত্ব আমাদের ভাগ করতে পারে, কিন্তু সাংস্কৃতিক প্রেম, জাতিগত বন্ধন আমাদের আবার একত্র করে।
আমি কৃতজ্ঞ La Voix des Jummas-এর প্রতি, যাঁরা এই আয়োজনকে বাস্তব রূপ দিতে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। তাঁদের ভিশন এবং নিষ্ঠা আমাদের সংস্কৃতির প্রতি তাঁদের গভীর ভালোবাসার প্রমাণ। তাঁরা বুঝেছেন, আমাদের পাহাড়ি সংস্কৃতি শুধু অতীতের নয়—এটা বর্তমান এবং ভবিষ্যতেরও। তাঁরা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন—”সংস্কৃতি বাঁচলে জাতি বাঁচে, শিল্প বাঁচলে আত্মা বাঁচে।”
আমার মনে হয়েছে, “Lullabies of the Hill” প্রদর্শনী যেন একটি কনফেশন বক্স—যেখানে আমাদের শিল্পী, দর্শক, সংগঠক সবাই মিলে স্বীকার করছেন যে আমরা অনেকদিন চুপ থেকেছি, অনেক কিছু হজম করেছি। কিন্তু আজ আমাদের ভেতরের সেই অব্যক্ত কান্না, প্রতিবাদ আর ভালোবাসা এই শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। আজ আমরা আবার বলছি—”আমরা হারিয়ে যাইনি। আমরা ইতিহাসে আছি। আমরা কণ্ঠে আছি। আমরা ক্যানভাসে আছি। আমরা আছি।”
এটা শুধুই তুফান চাকমার গল্প নয়। এটা আমাদের সকলের গল্প—যারা পাহাড়ে জন্মেছি, বা যাদের রক্তে পাহাড়ের ভাষা, গান, ব্যথা ও সাহস বইছে।
আমরা গর্বিত—আমরা আদিবাসী, আমরা পাহাড়ি, আমরা জুম্ম, আমরা বাংলাদেশী।
আমাদের এই পথচলা কারও একার নয়, এটা আমাদের সম্মিলিত স্মৃতি, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সৃজনশীলতার সেতুবন্ধ।
তুফান চাকমা, আপনার তুলিতে আমরা আমাদের হারানো শব্দগুলো খুঁজে পেয়েছি।
La Voix des Jummas, আপনাদের উদ্যোগে আমরা পেয়েছি আত্মপরিচয়ের এক নতুন দিগন্ত।
রানী ইয়েন ইয়েন, আপনার ছায়ায় আমরা সাহস পেয়েছি আবার দাঁড়ানোর।
এই প্রদর্শনী শুধু ছবি নয়, এটা আত্মার ভাষায় লেখা এক উপাখ্যান—যার প্রতিধ্বনি বহু দূরে, বহু হৃদয়ে বাজবে… বহুকাল।
জয় হোক আমাদের শিল্পের, জয় হোক আমাদের সংস্কৃতির, জয় হোক আমাদের পরিচয়ের।


