সাংবাদিকতা কার্যত সেবাধর্মী পেশা। বর্তমান যুগে এ পেশা সুবিধাবাদী সুচতুর সাংবাদিকদের জন্য ‘পৌষ মাস’ আর সৎ সাংবাদিকদের জন্য ‘সর্বনাশ’ হয়ে উঠেছে। কারণ গণমাধ্যমে চাকরি করে একই পদের সাংবাদিকদের আর্থিক অবস্থানের তারতম্য গোটা কমিউনিটিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। কেউ দামি গাড়ি হাঁকেন কেউ বাসের গেইটে ঝোলেন। কেউ পাঁচ তারকা হোটেলে খান কেউ ফুটপাতের ছালাদিয়া হোটেলে খান। আমলা-পুলিশ প্রশাসনে ক্ষমতার অবৈধ ব্যবহারে ঘুষ খেয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন, এ খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু সাংবাদিকদের মধ্যে কিছু সাংবাদিক কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন কিভাবে?
এক সময় সাংবাদিকতা ছিল একটি মহৎ পেশা। সাংবাদিক ছিল সমাজের দর্পণ, মানুষের কণ্ঠস্বর। কিন্তু এখন? এখন প্রশ্ন ওঠে—তিনি কি সাংবাদিক, নাকি সাংঘাতিক?
আধুনিক “সংবাদিকতা” যেন কেমন এক বিপরীত ধারা। কিছু কিছু লোক সাংবাদিকতার ছদ্মবেশে সমাজে ভয় ছড়াচ্ছে, চাঁদাবাজি করছে, ক্যামেরা দেখে সবাই কাঁপে—নাম সাংবাদিক, অথচ কাজ সাংঘাতিক!
আজকাল প্রেস কার্ড যেন জাদুর কাঠি! যেখানে যায়, সেখানে “আপনে চিনেন না আমাকে?” বলেই দরজা খোলে। পুলিশের রুটিন চেকিং হোক বা সরকারি অফিস—আমি মিডিয়া থেকে এসেছি” বললেই যেন এক অদৃশ্য সিঁড়ি মেলে যায়। সাংবাদিক নয়, যেন গুপ্তচর! অথচ এই ‘মিডিয়া’ কার্ডের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ব্যক্তি জানেই না সংবাদের মানে কী!
একটা সময় রিপোর্টাররা যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন তৈরি করত। আর এখন? একটা ঘটনার গন্ধ পেলেই ফেসবুক লাইভ। পাশে মানুষ মরছে, আর এদিকে তিনি বলছেন—ভিউয়ার্স, ঘটনাস্থল থেকে আমি বলছি…” যেন মৃত্যু নয়, এটি একটি নাটক! বাস্তব কাহিনি নয়, এটা তার কনটেন্ট। চোখে জল নয়, মুখে স্মার্টফোন!
অনেকেই সাংবাদিকতা বেছে নেয় কারণ তারা চায় অবাধ প্রবেশাধিকার, ব্যক্তিগত লাভ। কিছু তথাকথিত সাংবাদিকের ‘খবর’ মানেই কার কাকে হুমকি দেওয়া যায়, কার দোকান থেকে চাঁদা তোলা যায়। সংবাদ নয়, তারা খোঁজে সুযোগ—লোকজনকে ভয় দেখিয়ে পকেট ভরানোই যেন আজকের টার্গেট। কোথাও দুর্ঘটনা ঘটলে আগে ছুটে আসে সাংবাদিক নয়, চ্যানেলবাজ বাহিনী!
যেখানে সত্য সংবাদ তুলে ধরার কথা, সেখানে এখন গুজব আর গসিপ। কে কী পরল, কে কার সঙ্গে দেখা করল, কার বিয়ে ভাঙল—এসব নিয়েই আজ ‘টপ স্টোরি’। আর কোনো বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ? তা খুঁজতে গেলে যেন জাদুঘরে যেতে হয়।
এক সময় হলুদ সাংবাদিকতা শব্দটি বেশ উচ্চারিত হতো। আর্থিক লাভালাভের কারণে রিপোর্টিংয়ে অতিরঞ্জিত শিরোনাম, অযাচাইকৃত দাবি, পক্ষপাতমূলক এজেন্ডা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হতো। তাকে বলা হতো হলুদ সাংবাদিকতা। এখন হলুদ সাংবাদিকতা নয়, আদর্শ নীতি নৈতিকতা ভুলে টাকার কাছে সাংবাদিকরাই বিক্রী হয়ে যাচ্ছেন।
কবি মহাদেব সাহার কবিতা ‘যতোই চাও না কেন আমার কণ্ঠ তুমি থামাতে পারবে না, যতোই করবে রুদ্ধ ততোই দেখবে আমি ধ্বনি-প্রতিধ্বনিময়’। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে এমন সাংবাদিকের বড়ই প্রয়োজন।
এখনও বহু সৎ সাংবাদিক আছেন, যারা রাতদিন খেটে সত্যের অনুসন্ধান করেন। ঝড়–বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাঠে নামেন, মানুষের কথা তোলেন। তারাই আসল সাংবাদিক—যাদের কলমে আগুন নেই, আছে আলোর পথ।
দেশে সৎ সাংবাদিকতা কার্যত হুমকির মুখে পড়ে গেছে। এ হুমকি রাষ্ট্রের কোনো কালাকানুন, গণমাধ্যম বিরোধী আইন এবং শাসকদের রক্তচক্ষুর জন্য নয়; হুমকির কারণ গণমাধ্যম জগতে সাংবাদিকদের আর্থিক বৈষম্য ও যাপিত জীবনের ফারাক এবং লোভাতুর সাংবাদিকতা বেড়ে যাওয়া। কিছু সুবিধাবাদী সাংবাদিক আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ; আর কিছু সাংবাদিকের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। অর্থনীতির এই ব্যবধান কিছু সাংবাদিকের মধ্যে ‘লোভ বিপ্লব’ ঘটাচ্ছে।
পরিশেষে বলি,আমরা সাংবাদিকতা চাই, সাংঘাতিকতা নয়। চাই অনুসন্ধানী চোখ, হুমকির চোখরাঙানি নয়। সত্যের চর্চা চাই, চাটুকারিতা নয়।
সাংবাদিকের কলম হোক জনগণের আয়না, আর তার ভূমিকা হোক সাহসিকতার প্রতীক।
আমাদের অতীত যতই উজ্জ্বল হোক না কেন, সাংবাদিকতার প্রতি জনসাধারণের আস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
আরও গৌরবান্বিত হোক সাংবাদিকতা। আর সাংবাদিকতা পেশার যে অবনমন ঘটছে, তা থেকে কিছুটা উত্তরণ ঘটতেও পারে। এই আশা নিশ্চয় নিরর্থক নয়।
লেখক:
সিনিয়র চিত্রসাংবাদিক
ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি, চট্টগ্রাম ব্যুরো


