১৮ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রচ্ছদঅন্য খবরচারুকলার এই অবকাঠামোকে সম্পূর্ণ চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হোক

প্রসঙ্গঃ ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজ

চারুকলার এই অবকাঠামোকে সম্পূর্ণ চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হোক

শিশির মল্লিক

জাতীর পরিচয় তার সংস্কৃতির মধ্যে। ভাষা-সাহিত্য-শিল্প ও সংস্কৃতির ওপরই একটি জাতীর আত্মমর্যাদা ও গৌরবের পরিচয় অন্যান্য জাতীর কাছে সমাদৃত হয়।

কিন্তু আমরা এমনই দুর্ভাগা জাতি যে, সুদীর্ঘ সময়ব্যাপী ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে তাদের দ্বারা , তাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রুচিতে গড়ে ওঠা এদেশীয় একটি চাপরাশি শ্রেণী কর্তৃক একটি নব্য ঔপনিবেশিক শাসনের আওতাভূক্ত হয়েছি। তাতে এদেশের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মুক্তি না আসলেও সেই বহির্শক্তি ও তাদের এদেশীয় সহযোগি শ্রেণীর একটি শ্রেণী বিকশিত হয়েছে। যাদের জীবন-যাপন, রুচি-অভ্যাস ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের মতো নয়। তারা এদেশ থেকে উপার্জন করলেও তারা এদেশকে মর্যাদা দেয় না। সম্মান ভালোবাসা তো নয়। তারা প্রত্যেকে বহির্দেশের নাগরিকত্ব ও সেখানকার জীবনকে আদর্শ মনে করে। বংশধরদের প্রতিষ্ঠা করে সেখানকার শিক্ষায়। এটি এখনকার সচ্চল মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। দেখা যাচেছ নিন্ম মধ্যবিত্তদেরও এখন এটি আরাধ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

ফলে জাতীয় নেতৃত্বে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। রাজনীতিতে কোন ভরসার নেতৃত্ব আজ আমাদের সামনে নেই বললেই চলে। শাসক শ্রেণীর বিভিন্ন অংশ ও তাদের রাজনীতির দলাদলি ও ক্ষমতায় আরোহনের প্রতিযোগিতায় কে কত বেশি সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের পক্ষে তার পরিচয় সুনিশ্চিত করতে যেয়ে দেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে রূপ দিয়েছে। যেটা কট্টর পাকিস্তানী তথাকথিত ইসলামী রাষ্ট্রের কনসেপ্ট থেকে বেরিয়ে এসে একটি বহুজাতিক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে পরিচিত লাভের সুযোগ আমাদের হাতে এসেছিলো। কিন্তু তৎকালীন আওয়ামী নেতৃত্ব তা নসাৎ করেছে। তার উত্তরসুরী হিসেবে বিএনপি, জাতীয়পার্টিও একই কাজ করেছে।

বিএনপি নেতৃত্ব আওয়ামী ও ভারতীয় আধিপত্যের বিরোধী রাজনীতির পরিচয় দাঁড় করাতে যেয়ে, পাল্টা মার্কিন ও পাকিস্তান পন্থী রাজনীতিকে পুনর্বাসন করেছে। যা আজ তাদের জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে সামনে এসেছে।

এসবই হয়েছে সুদীর্ঘ সময়ের ঔপনিবেশিক কাঠামোয় গড়ে ওঠা শ্রেণীর কারণেই। যারা এদেশীয় হলেও বাইরের শক্তিগুলোর কাছে নির্ভরশীল ও নিয়ন্ত্রিত ছিলো বলেই। তাই আত্মনির্ভরশীল আত্মপরিচয়ে উদ্বুদ্ধ রাজনীতি ও নেতৃত্ব এদেশে গড়ে ওঠেনি। যতো নৈরাশ্যের কারণ জাতীয় জীবনে এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর এহেন ব্যর্থতা।

তাই স্বাধীন অর্থনীতি যেমন আমাদের নেই। নেই রাজনীতি ও দর্শনের ক্ষেত্রে কোন নতুন উদ্ভাবন, নেই সংস্কৃতি ও শিল্প-সাহিত্যেরও নবধারার সমৃদ্ধি। নকলনবীশি আর দাস্যবৃত্তিই এদেশের অর্থনীতি-রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়।

আমিও এর মধ্যে বাস করে নিজেকে মহিমান্বিত করতে পারি না। আমার পরিচয়ও এই। খারাপ লাগা কখনো কখনো বিধ্বংসী হয়ে ওঠে, ওঠে এ কারণেই যে, আমি তো একজন শিল্পী। যার কোন প্রয়োজন নেই এই জাতীর কাছে। যারা অপাংক্তেয় পুরো সমাজের কাছে। তাদের মেধার কোন মূল্যায়ন কিংবা পৃষ্ঠপোষকতা নেই এখানে। দেখানোর মতো কিছু ব্রান্ডিং করা বিশ্ববিদ্যালয়ভুক্ত শিক্ষকরাই এখানের পরিচিত মুখ। মিডিয়া তাদের নিয়ে নর্তন-কুর্দন করে। একটা ব্রাহ্ম সমাজেই যেন আমরা বাস করছি। প্রতিটি জায়গায় এই সম্ভ্রান্ত ও সফল মানুষদের জয়জয়কার। তাদের গল্প সাধারণ থেকে অনেক দূরে! সাধারণরা তা থেকে যেন অচ্ছুৎ!!!

শিল্প চর্চার কোন প্রয়োজন আছে এ বিষয়টি এদেশের শাসকরা বুঝে না। তাই দেখি যেকটি প্রতিষ্ঠানই গড়ে উঠেছে তার পেছনে কিছু ব্যক্তি মানুষেরই ভূমিকা ও ত্যাগ আমাদের জাতীর কিছুটা পরিচয় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সেই ত্যাগে গড়ে ওঠা শিল্প পিঠস্থানের মধ্যে একসময়ের চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজের ভূমিকা স্ববিশেষ উল্লেখযোগ্য ও স্মরণীয়।

এই প্রতিষ্ঠানটি যিনি গড়ে তুলায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেনে তিনি আমাদের জাতীর সাংস্কৃতিক জগতের কীর্তমান পুরুষ- শিল্পী রশিদ চৌধুরী। তাঁকে সহায়তা করেছেন তৎকালীন চট্টগ্রামের প্রতিথযশা ব্যক্তিত্বরা। তাদের অবদানও আজ অপাংক্তেয় এবং পরিত্যাজ্য বলে বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানটি অনেক বিশ্বমানের শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মী-সংগঠনের জন্ম দিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা নিয়েছে এমন বহু মুক্তিযোদ্ধাও আমাদের জন্য গর্বের ও সম্মানের।

শুরুর দিকে শিক্ষকদের যে সীমাহীন ত্যাগ ও প্রচেষ্টায় এটি তৈরি হয়, একসময় তা সরকারী হিসেবে অনুমোদন লাভ করে। পরে আবার ইনিস্টিটিউটে রূপ পায়। এখন শুনি আবার সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হবে। মনে রাখা দরকার, এখানের শিক্ষক শিল্পী বনিজুল হক রাজশাহী চারুকলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করে যা আজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ভুক্ত ইনিস্টিটিউটে রূপ পেয়েছে। এখানকার শিল্পীরা এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। যারা গর্ব করে বলে আমি চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজের ছাত্র, সেই পরিচয় মুছে ফেলা হলে আমিই বা আমার উত্তর পুরুষদের কি পরিচয় দেবো? অথচ যে স্কুলে পড়েছিলাম পি.সি. সেন সারোয়াতলী হাই স্কুল, যেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ১৯০০ সালে। সেটি এখনো আছে। অথচ আমার কলেজ নেই। সেখানে চারুকলা নামের কোন প্রতিষ্ঠান এখন আর নেই। সেটা আমলা মন্ত্রী বা ধনবান জনগোষ্ঠীর প্রমোদাগার বা অন্যকিছু হিসেবে ব্যবহৃত হবে! এটা আমি মেনে নিই কিভাবে! এতো নিজের অস্তিত্ব হরণের মতো বিষয় হয়ে দাঁড়ালো।

তাই আজ লিখতে হচ্ছে- না, তোমরা আমার পরিচয় মুছে ফেলতে পারো না। আমাকে মুছে ফেলতে পারো না। আমি জীবনের শেষদিন হলেও এখানে যেয়ে দাঁড়াবো। বলবো আমি এখানেই বড় হয়েছি। এ প্রতিষ্ঠানই আমাকে বড় করেছে। আমি শিল্পী হয়েছি। আর শিল্পী হয়েছি বলেই আমি মানুষ হবার লড়াইটা চালিয়ে যেতে পেরেছি। শিখেছি সংস্কৃতিহীন মানুষ যেমন মানুষ নয়, তেমনি সংস্কৃতিহীন জাতিও কোন জাতি নয়। তার পরিচয় দেবার কিছু থাকে না, সে হয় নিঃস্ব।

আমার মতো অনেকেই তাদের এই আত্মপরিচয়ের ঠিকানার সুরক্ষা চাই। তাদের প্রতি অকৃত্রিম স্নেহ, প্রেম, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। বলি, আমরা এটিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য দাবী রাখবো। তার জন্য লড়ে যাবো। আমরা চাই একে একটি সম্পূর্ণ চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হোক। অবকাঠামোটি যা আছে তাতে এর কার্যক্রম শুরু করা যাবে। পরবর্তীতে সাবজেক্টওয়াইজ কাঠামো বাড়ানো ও বিস্তৃত করা যাবে। তাই সবাইকে পুরোনো দাবী নয়, কলেজ নয়, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড চালানোর কোন সংস্থা নয়। একে একটি সম্পূর্ণ নতুন দেশের প্রথম চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হোক। আমাদের এ দাবী মোটেই অযৌক্তিক নয়। এটা অসম্ভবও নয়। এটা সম্ভব। সরকারের কাছে আমাদের এ দাবী পৌঁছে যাক। ক্ষমতায় যে থাকুন বা আসুন, আমাদের চাওয়াটা জাতীর অস্তিত্বের সাথে যুক্ত। চট্টগ্রাম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং ঐতিহ্যবাহী শহর, এর অঙ্গসৌষ্ঠব যে প্রতিষ্ঠান ঘিরে ছিলো তাকে আরো বিকশিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

এটি আজ জাতীয় দাবী। এটি কোন ব্যক্তি বা কিছু মানুষের চাওয়া নয়, এটি পুরো জাতির আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয়কে সুউচ্চতম জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্যই দরকার। আশা রাখছি আমরা আমাদের স্বপ্নকে মর্যাদা ও সম্মান দেবো। যিনি এই স্বপ্নের অনুমোদন করবেন তিনি হবেন আমাদের অহংকার । আমরা থাকবো তার কাছে ঋণী।

জয় হোক, শিল্পের
জয় হোক সংস্কৃতি চর্চার
জয় হোক সুন্দরের
জয় হোক যা কিছু ভালোর।

 

লেখক:
কবি ও চিত্রশিল্পী

সর্বশেষ

sakarya escort bayan bayan Eskişehir escort