
অন্যসময় ডেস্ক
আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর নবনির্মিত সুদৃশ্য ভবনটির দ্বিতীয় তলায় উঠতেই চোখে পড়ল ছাদের সঙ্গে টাঙানো একটি যুদ্ধ বিমান। নাম ‘হকার হান্টার’। আসন একটাই, চালকের। ভেতরে প্রস্তুত থাকত কামান, মিসাইল ও বোমা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই হকার হান্টার যুদ্ধবিমানটি পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য ত্রাস হয়ে উঠেছিল। ভারতীয় বিমানবাহিনীর এই যুদ্ধবিমান দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বেশকিছু ঘাঁটি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে এটি। একাত্তরের স্মৃতিবিজড়িত সেই নিদর্শন ঠাঁই পেয়েছে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নবনির্মিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলায় উঠতেই বিশাল করিডরে দেখা মিলল শিখা চির অম্লানের। চারপাশে পানি আর মাঝখানে শহীদের স্মৃতি নিয়ে জ্বলছে শিখা। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নির্মিত হয়েছে এই শিখা চির অম্লান। শুধু যুদ্ধবিমান নয়, শিখা চির অম্লান নয়, বাঙালির গৌরবের অনন্য সব স্মৃতির সম্ভারে সেজেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক দেশের প্রথম জাদুঘর। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের লক্ষ্যে ব্যক্তি পর্যায়ের উদ্যোগে জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ। ৫ সেগুন বাগিচার ছোট্ট দোতলা বাড়িটিতে। মুক্তিযুদ্ধের অনেক দুর্লভ বস্তু আছে এই জাদুঘরে। তবে প্রতিষ্ঠার ২১ বছর পর নিজস্ব ভবনে স্থান্তরিত হয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। নতুন ঠিকানা এফ ১১/এ বি সিভিক সেক্টর, আগারগাঁও। শুধু নতুন ভবনই নয়, এটির পরিসরও বেড়েছে। যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন নির্দেশনা। জনসাধারণ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারের দেওয়া তহবিলে জাদুঘরের নয়তলা ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে।
১৬ এপ্রিল ২০১৭ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করেন। তিনিই ২০১১ সালের ৪ মে ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে নির্মাণ কাজের সূচনা করেছিলেন।
দৃষ্টিনন্দন ও স্থাপত্যশৈলীর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ভবনটি আগারগাঁও পঙ্গু হাসপাতালের উল্টো দিকে চক্ষু বিজ্ঞান হাসপাতালের পাশে অবস্থিত। ছাদের ওপর আর সামনের দেয়াল থেকে কামান-বন্দুকের নলের মতো নানা আকারে কংক্রিটের নল বেরিয়ে এসেছে। কাছে গেলে দেখা যায় দেয়ালের ওপর কিছু কিছু ক্ষত চিহ্ন। এমন ক্ষত চিহ্নগুলো দেখে স্বাধীনতা যুদ্ধের ক্ষতের একটি আবহ তৈরি হবে দর্শনার্থীর মনে। এমনটিই মনে করেন স্থপতি তানজিম হাসান।
মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও ইতিহাস তুলে ধরতে অনন্য পরিকল্পনায় সাজানো হয়েছে জাদুঘরের গ্যালারিগুলো। প্রতিটি গ্যালারিও রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী নানা স্মারক। রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ নানা ডকুমেন্ট। একই সঙ্গে রয়েছে নানা স্মারক ডিজিটাল প্রযুক্তিতে তুলে ধরার ব্যবস্থা।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, মরণপণ যুদ্ধ করেছেন, তাদের নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে জাদুঘরে রয়েছে নানা স্মারক ও নিদর্শন। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার দূর্লভ আলোকচিত্র, চিঠিপত্র, ভিডিও চিত্র, দলিল, স্মৃতিচিহ্নের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিটি গ্যালারি সাজানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এখানে প্রায় ২৫ হাজার নিদর্শন রয়েছে। গ্যালারিগুলোতে ঘুরে ফিরে তা দেখা যাবে। এছাড়া রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। অডিও-ভিডিও ভিজুয়ালের মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের নানা নিদর্শন।
নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের নানা বিষয় জানাতে জাদুঘরে রয়েছে ইন্টার অ্যাকটিভ স্পেস ও ওপেন এয়ার থিয়েটার। এছাড়া রয়েছে তিনটি সেমিনার হল ও ২৫০ আসনের একটি অডিটোরিয়াম। তাতে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নাটক, চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও অন্যান্য পারফর্মিং আর্ট প্রদর্শন করার ব্যবস্থা রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের গবেষণার জন্য রিসার্চ অ্যান্ড আর্কাইভের স্থানও রাখা হয়েছে। প্রায় আড়াই বিঘা জায়গার ওপর নির্মিত এই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তিনটি বেসমেন্ট ও পাঁচটি ফ্লোর রয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার ব্রোঞ্জের ম্যুরাল। নতুন ভবনে রয়েছে বিশাল আকারের চারটি গ্যালারি। গ্যালারিগুলো ভবনের চতুর্থ ও পঞ্চম তলায়। সেগুলোর আয়তন সব মিলিয়ে ২১ হাজার বর্গফুট। লিফটের তিনে উঠতেই এক নম্বর গ্যালারি। গ্যালারিটির নাম ‘আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংগ্রাম’। এই গ্যালারিতে রয়েছে প্রাচীন বঙ্গের মানচিত্র, পোড়ামাটির শিল্প, টেরা কোটা ও নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন। ছবিসহ নানা নিদর্শনের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপট। ধাপে ধাপে এই গ্যালারিতে উঠে এসেছে সত্তরের সাধারণ নির্বাচনের সময় পর্যন্ত নানা স্মারক।
দ্বিতীয় গ্যালারির নাম ‘আমাদের অধিকার, আমাদের ত্যাগ’। এই গ্যালারিতে ঢুকতেই চোখে পড়বে বঙ্গবন্ধুর বিশাল আকৃতির আলোকচিত্র। সেটি ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের। পাশেই পর্দায় দেখানো হয় ভাষণটির ভিডিও চিত্র। তার সামনেই ছোট্ট কাচের বাক্সে রাখা ওই দিন সন্ধ্যায় সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো আওয়ামী লীগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও ভাষণের রেকর্ড। এরপর কালো টানেলের পুরোটা জুড়ে রয়েছে ২৫ মার্চ কাল রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার নানা নিদর্শন। আলোকচিত্রে, ভিডিওচিত্রে নানা ভাবে উঠে এসেছে সেই কাল রাতের ভয়াবহতার করুণ ও নির্মম দৃশ্য। এরপর মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় অস্থায়ী সরকার গঠনের নানা পর্বও তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া স্বাধীনতার ঘোষণা, ৪ এপ্রিল কুষ্টিয়ায় যুদ্ধ এবং সারা দেশের গণহত্যার নিদর্শন রয়েছে এই গ্যালারিতে আরো রয়েছে উদ্বাস্তু হয়ে পড়া বাঙালিদের শরণার্থী হিসেবে ভারতে যাত্রা, সেখানে আশ্রয়, জীবন যাপনের ঘটনাবলি। তৃতীয় গ্যালারির নাম ‘আমাদের যুদ্ধ আমাদের মিত্র’। এই গ্যালারিতে রয়েছে যুদ্ধ চলাকালীন অর্থাৎ ১ মে থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সব স্মৃতি।
চতুর্থ গ্যালারির নাম ‘আমাদের জয়, আমাদের মূল্যবোধ’। এখানে মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত নানা নিদর্শন দেখানো হয়েছে। ৭১ এর রণাঙ্গনে এক গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা বিলোনিয়া যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধারা প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে ভিন্নধর্মী রণকৌশল নিয়ে ছিলেন। বিলোনিয়া যুদ্ধের এই কৌশল স্যান্ড মডেল নামে পরিচিত। বিলোনিয়া যুদ্ধের সেই রণকৌশল মডেল একটি কাচের টেবিলে সাজানো রয়েছে। এই গ্যালারির একটি বিশেষ অংশে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলার নারীদের ওপর পাকিস্তানি হায়েনাদের বর্বরতা আর নির্যাতনের চিত্র। এখানে আরো প্রদর্শিত হয়েছে বিজয় স্মৃতি। বাঙালির প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দশন, মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ যুদ্ধ, যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, গণমানুষের দুরবস্থা, যৌথ বাহিনীর অভিযান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিজয়, মিত্রবাহিনীর অংশগ্রহণ, বুদ্ধিজীবীদের হত্যার নির্মমতার নানা আলোকচিত্র, আর ঢাকায় পাকিস্তানি দখলদারদের আত্মসমর্পণসহ নানা চিত্র ক্রমান্বয়ে দেখতে পাবেন দর্শনার্থীরা। বাছাই করা নিদর্শন গ্যালারিতে প্রদর্শন করা যাতে মুক্তিযুদ্ধের পুরো ঘটনা উঠে আসে। বাকিগুলো সংরক্ষিত আছে জাদুঘরের আর্কাইভে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কর্মকান্ড
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইতিহাসের স্মারক সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে যথাযথভাবে উপস্থাপন। এর বিশেষ লক্ষ্য নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার ইতিহাস বিষয়ে সচেতন করে তোলা, যার ফলে তারা মাতৃভূমির জন্য গর্ব ও দেশাত্মবোধে উদ্দীপ্ত হবে এবং উদার অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী হবে।
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর : ঠিকানা- প্লট # এফ-১১/এ-বি, আগারগাঁও শের-ই-বাংলা নগর, ঢাকা-১২০৭, ফোন-৮৮০-২-৯১৪-২৭৮১-৩, ফ্যাক্স-৮৮০-২-৯১৪-২৭৮০, ই-মেইল : mukti.jadughar@gmail.com, ওয়েব : liberationwarmuseumbd.org.com
সময়সূচি : গ্রীষ্মকালীন সোম থেকে শনিবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শীতকালীন সোম থেকে শনিবার ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। রবিবার জাদুঘর বন্ধ থাকে। প্রবেশ মূল জনপ্রতি ২০ টাকা। তবে ৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা বিনামূল্যে জাদুঘরে প্রবেশ করতে পারবে।


