
মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন
উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক মুক্তি সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পাকিস্তানের ক্ষমতায় থাকা আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটে এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। ২৪ মার্চ ১৯৬৯ আইয়ুব খান তৎকালীন পাকিস্তানি সেনা প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানকে চিঠি লিখে ক্ষমতা গ্রহণের আহ্বান জানান। জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহণের পর ২৮ নভেম্বর ১৯৬৯ ঘোষণা করেন, যত শীঘ্র সম্ভব তিনি প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের শাসনামলে ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে। বাকি ২টি আসনে জয়লাভ করেন সর্বজনাব নূরুল আমিন ও চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়। অপর দিকে পশ্চিম পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ১৩৮টি আসনে জয়লাভ করে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পি.পি.পি)। প্রাদেশিক পরিষদের অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করে। জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে রাঙ্গুনীয়া, রাউজান ও হাটহাজারী আসনে মরহুম এম. এ. ইদ্রিস এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মরহুম ডাঃ ক্যাপ্টেইন আবুল কাশেম জয়লাভ করেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনে রাঙ্গুনীয়ায় আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে এবং নির্বাচনে জয়লাভে হাতেগোনা যে কয়েকজন সক্রিয়া ভূমিকা পালন করেন, তাঁদের মধ্যে আমার বাবা মরহুম সফিউল আহমদ তালুকদার, প্রাক্তন চেয়ারম্যান, হোসনাবাদ ইউপি একজন ছিলেন। পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের াকছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। ১ মার্চ ১৯৭১ আমি সেদিন যথারীতি স্কুলে গিয়েছি। টিফিন পিরিয়ডের পরে ৫ম পিরিয়ডের ক্লাস শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর পিয়ন নোটিশ বই নিয়ে ক্লাসে আসলে শ্রেণি শিক্ষক নোটিশ পড়ে শোনালেন, অনিবার্য কারণবশত: স্কুল ছুটি দেওয়া হলো। স্কুল থেকে বের হয়ে দেখলাম রাস্তায় লোকে লোকারণ্য। রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা খুবই কম। লোকজন পায়ে হেঁটে যে যার গন্তব্যে যা”েছ। আমি বাসে করে স্কুলে যাওয়া আসা করতাম। কোন যানবাহন না পেয়ে বাসার দিকে হাঁটা শুরু করলাম। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের কাছাকাছি এসে মোহাম্মদপুর টু গুলিস্তানগামী একটা বাস পেয়ে উঠে পড়ি। নিউমার্কেট পার হয়ে নীলক্ষেতে এসে দেখলাম ছাত্র, শ্রমিক ও জনতা লাঠিসোটা হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে শ্লোগান দি”েছ Ñ তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। বীর বাঙালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। লোকমুখে শুনলাম ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ১৯৭১ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য ¯’গিত ঘোষণা করেন। বাসায় আসার পথে দেখলাম অসংখ্য মিছিল। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ¯’গিত করায় ছাত্র, শ্রমিক জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বাসায় এসে শুনি দুপুরে জাতীয় সংসদের অধিবেশ ¯’গিত ঘোষণা করায় ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান টিমের সাথে কমনওয়েলথ টিমের ক্রিকেট খেলা চলাকালীন সময়ে দর্শকেরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। গ্যালারীতে ভাঙচুর করে, আগুন ধরিয়ে দেয়। এ বিক্ষোভ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমি তখন ধানমন্ডি গভঃ বয়েজ হাইস্কুলের ছাত্র। আমি আমার পরম শ্রদ্ধেয় জেঠা মরহুম সুলতান আহমদ এর বাসা “চামেলী হাউস” (বর্তামন সিরডাপ মিলনায়তন) ১৭, তোপখানা রোডের দোতলায় থাকতাম। আমার জেঠা তখন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন। স্বাধীনতার পরে অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন টিমের সদস্য ছিলেন। আমি বাসে চড়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করতাম। তৎকালীন ইপিটিআরসি’র ১৫ নং রুটের বাস গুলিস্তান থেকে ছেড়ে প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে পলাশী, নিউমার্কেট, আসাদ গেইট হয়ে মিরপুর এবং ১২ নং রুটের বাস গুলিস্তান থেকে ছেড়ে প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে শাহবাগ, ফামগেইট, আসাদ গেট (তৎকালীন আইয়ুব গেইট) হয়ে মিরপুর যেত। ২ ও ৫ নং রুটের বাস গুলিস্তান থেকে ছেড়ে প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে পলাশী, নিউমার্কেট, আগাদ গেইট হয়ে যথাক্রমে মোহাম্মদুর ও মিরপুর যেত। আমি প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে বাসে উঠে ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে স্কুলে পৌঁছে যেতাম। ১২ ও ১৫ নং রুটের বাস ভাড়া ০.১৮ পয়সা এবং ২ ও ৫ নং রুটের বাস ভাড়া ০.১৫ পয়সা ছিল। ছাত্রদের আইডি কার্ড দেখালে ০.১০ পযৃসা ভাড়া নেওয়া হতো। পরদিন ২ মার্চ ১৯৭১ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাসার সামনে মাঠে পাকিস্তানি সেনাবাহিনি তাঁবু খাটিয়ে ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অব¯’ান নেয়। সম্ভাব্য বিপদ আঁচ করতে পেরে আমার জেঠা পরদিন ৩ মার্চ হরতালের মধ্যে ইস্কাটন¯’ নাসিমন বিল্ডিংয়ের নীচ তলায় বাসা বদল করেন। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, ক্লাস হ”েছ না। পড়ালেখায় মন বসে না। বাসায় অজানা আশংকায় দিন কাটছে। ঢাকা শহর মিছিল মিটিংয়ের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ৭ মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ঘোষণা করেনÑ “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” বযসে ছোট হওয়ার কারণে সে ঐতিহাসিক জনসভায় যেতে পারিনি। পরদনি ৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। পত্রিকা পড়ে, রেডিওতে খবর শুনে বাসায় অলস সময় কাটে। আমি মা-বাবার অতি আদরের ছোট ছেলে। দেশের এ অব¯’ায় আমার দাদি, মা-বাবা, ভাইবোন আমার জন্য খুবই চিন্তিত ছিল। সার্বিক পরিবেশ, পরি¯ি’তি বিবেচনা করে আমার জেঠা আমাকে মার্চ/৭১ মাসের তৃতীয় সপ্তাহের প্রথমদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এ.জেড.এম নাসির উদ্দিন সাহেবের আত্মীয়দের সাথে চট্টগ্রাম শহরে পাঠিয়ে দেন। আমি চট্টগ্রাম শহরে এসে রাঙ্গুনীয়ায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত এমপি জনাব ডাঃ ক্যান্টেন আবুল কাসেম সাহেবের দেওয়ানজি পুকুর পাড়ের বাসায় রাত্রিযাপন করি। পরদিন সকালে চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নরত আমার মেজোভাই মোঃ নাজিম উদ্দিন এর সাথে দেখা করার জন্য শেরে বাংলা হোস্টেলে যাই। কিš‘ সেখানে ওনার দেখা পাইনি। ঐদিন বিকালে ডাঃ ক্যাপ্টেন আবুল কাসেম সাহেবের সাথে শান্তিনিকেতন পর্যন্ত যাই এবং শান্তিনিকেতন থেকে রিক্সাযোগে সন্ধ্যার আগে বাড়িতে পৌঁছি। বাড়িতে যাওয়ার পরে আমাকে পেয়ে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন এবং চিন্তামুক্ত হন। ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে ঢাকা শহরে পাকিস্তানি সেবাবাহিনী ঠান্ডা মাথায় নৃশংসভাবে নিরস্ত্র, নিরপরাধ ও ঘুমন্ত বাঙালীর উপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ অব¯’ায় মানুষ আতংকিত হয়ে পড়ে। শহর থেকে মানুষ দলে দলে গ্রামে চলে আসতে থাকে। খুব সম্ভবত: ২৬ অথবা ২৭ মার্চ, ১৯৭১ সর্বজনাব বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম, রাঙ্গুনীয়া থানা কমান্ডার, প্রাক্তন এডিশনাল আইজিপি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ছালেহ আহমেদ সাহেবসহ আরো কয়েকজন আমাদের বাড়িতে এসে অব¯’ান নেন। আমাদের বাড়িটা রাস্তার সংলগ্ন হওয়ায় আমাদের বাড়িতে থাকা নিরাপদ বোধ না হওয়ায় ওনারা দু’এক দিন পর পারুয়ায় আমাদের ফুফাতো ভাই নুরুল আলম ভাইদের বাড়িতে চলে যান। নুরুল আলম ভাইও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। খুব সম্ভবত: জুলাই/৭১ মাসের শেষের দিকে আমাদের মেজো ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নাজিম উদ্দিনকে চট্টগ্রাম কলেজের শেরে বাংলা হোস্টেল থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী দোসররা ধরে নিয়ে যায়। তিনি চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। আমার বাবা মেজো ভাইয়ের খোঁজে প্রতিদিন সকালে চট্টগ্রাম শহরে যেতেন এবং অনেক রাতে বাড়িতে ফিরতেন। অবশেষে অনেক চেষ্টা তদবিরের ফলশ্রুতিতে ১৪ আগস্ট ১৯৭১ পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে সাধারণ ক্ষমায় মেজো ভাই মুক্তি লাভ করেন। এর কিছুদিন পরে তিনি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যান। বীর মুক্তিযোদ্ধারা ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে রাঙ্গুনীয়ায় আসলে পরি¯ি’তি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। রাতে ঘুম থেকে জেগে দেখতাম পরিচিত, অপরিচিত অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে। আমার মা অসু¯’ শরীর নিয়ে রাত জেগে মাতৃ¯েœহে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রান্নাবান্না করে খাওয়াতেন। মাকে আমার বড়ো বোন নুরজাহান বেগম সহযোগিতা করতেন। গোপনীয়তার জন্য কাজের মেয়েকে ডাকা হতো না। আমিও রান্নাঘর থেকে খাবার দাবার, চা, নাস্তা আনার কাজে সহযোগিতা করেছি। কয়েকজন ¯’ানীয় মুক্তিযোদ্ধা আমাদের বাড়িতে এসে চাল, তরিতরকারি নিয়ে যেতেন। রাণীরহাটে অপারেশনের সময় একজন মুক্তিযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হলে ওনাকে আমাদের বাড়িতে চিকিৎসা করেন আমাদের ফুফাতো ভাই মরহুম ডাঃ আবুর কাসেম। আমাদের বড়ো ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শামশুদ্দিন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আমার বাবা দেশ মাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে জীবন বাজি রেখে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সব ধরণের সহযোগিতা প্রদান করেন। আমাদের দুই ভাইয়ের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য, সহযোগিতা করার কারণে আমাদের বাবা মরহুম সফিউল আহম্মদ তালুকদারকে তৎকালীন রাঙ্গুনীয়া থানার ওসি বেশ কয়েকবার থানায় ডেকে নিয়ে যান। আমরা অজানা আশংকায় দুরুদুরু বুকে বাবার অপেক্ষায় থাকতাম। আমার মা, দাদি খাওয়া-দাওয়া করতেন না। বাবা ফিরে না আসা পর্যন্ত দাদি জায়নামাজে বসে থাকতেন। তখন স্কুল বন্ধ থাকায় পড়ালেখাও বন্ধ ছিল। বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকা এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবর শুনার জন্য আমরা গভীর আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করতাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠান বিশেষ করে “চরম পত্র”, “জল্লাদের দরবার” মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী বাঙালীদের ভীষণভাবে উজ্জীবিত করতো। আমিও পারুয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা ইফতেখার হোসেন এর ছোট ভাই আমার সহপাঠী বন্ধু আলমগীর হোসেন আমাদের প্রিয় বিদ্যাপীঠ রাঙ্গুনীয়া খিলমোগল রসিক উ”চ বিদ্যালয়ের দেয়ালেÑ “এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে”। “সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী”। “বাংলার মায়েরা, মেয়েরা সবাই মুক্তিবাহিনী”Ñ প্রভৃতি পোষ্টার অত্যন্ত দুঃসাহস করে লাগিয়েছি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের দোসরদের সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যকারী, সহযোগিতাকারীদের বাড়িঘর লুটপাট করছে, অগ্নিসংযোগ করছে। নিরীহ মানুষদের নির্বিচারে গুলি করে মারছে। সে আশংকায় আমরা সব সময় আতংকের মধ্যে ছিলাম। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) আত্মসমর্পন করে। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে এ বিজয় অর্জিত হয়। এ বিজয় অনেক আনন্দের, অনেক বেদনার। ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ আমাদের এবং আশেপাশের গ্রামের সব মুক্তিযোদ্ধা ফিরে আসে। শুধু ফিরে আসেন নাই আমাদের মেজো ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নাজিম উদ্দিন। বীর মুক্তিযোদ্ধারা রাঙ্গুনীয়া থানায় এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী রাঙ্গুনীয়া কলেজে অব¯’ান নেয়। দু’একদিন পরে মেজো ভাই ভারতীয় বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে বিকালে রাঙ্গুনীয়া কলেজ মাঠে নামেন। ঐদিন রাতে তিনি আমাদের বাড়িতে আসেন। ওনাকে দেখে আমি চিনতে পারিনি। মাথায় লম্বা চুল, মুখ ভর্তি দাড়ি, জলপাই রংয়ের ভারি শার্ট-প্যান্ট, পায়ে বুট, কাঁধে এসএমজি/ স্টেনগান। উনি আমাকে জড়িয়ে ধরার পরে ওনাকে চিনতে পারি। মেজো ভাই ফিরে আসার পরে আমরা বিজয়ের আনন্দে শরীক হই। কিছুদিন পরে ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী শরণার্থীরা দেশে ফিরে আসতে শুরু করে। শুরু হয় ধ্বংস প্রাপ্ত দেশ বিনির্মাণের কাজ। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা আমার তোমাদের ভুলবো না আমরা তোমাদের ভুলবো না … [বি:দ্র:- এ লেখাটি সম্পূর্ণ স্মৃতি থেকে লেখা, মুক্তিযুদ্ধ একটি খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। তথ্যগত কোন ভুল থাকলে তা অনি”ছাকৃত। এজন্য দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।] স্মৃতিতে একাত্তর মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত) উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক মুক্তি সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পাকিস্তানের ক্ষমতায় থাকা আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটে এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। ২৪ মার্চ ১৯৬৯ আইয়ুব খান তৎকালীন পাকিস্তানি সেনা প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানকে চিঠি লিখে ক্ষমতা গ্রহণের আহ্বান জানান। জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহণের পর ২৮ নভেম্বর ১৯৬৯ ঘোষণা করেন, যত শীঘ্র সম্ভব তিনি প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের শাসনামলে ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে। বাকি ২টি আসনে জয়লাভ করেন সর্বজনাব নূরুল আমিন ও চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়। অপর দিকে পশ্চিম পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ১৩৮টি আসনে জয়লাভ করে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পি.পি.পি)। প্রাদেশিক পরিষদের অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করে। জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে রাঙ্গুনীয়া, রাউজান ও হাটহাজারী আসনে মরহুম এম. এ. ইদ্রিস এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মরহুম ডাঃ ক্যাপ্টেইন আবুল কাশেম জয়লাভ করেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনে রাঙ্গুনীয়ায় আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে এবং নির্বাচনে জয়লাভে হাতেগোনা যে কয়েকজন সক্রিয়া ভূমিকা পালন করেন, তাঁদের মধ্যে আমার বাবা মরহুম সফিউল আহমদ তালুকদার, প্রাক্তন চেয়ারম্যান, হোসনাবাদ ইউপি একজন ছিলেন। পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের াকছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। ১ মার্চ ১৯৭১ আমি সেদিন যথারীতি স্কুলে গিয়েছি। টিফিন পিরিয়ডের পরে ৫ম পিরিয়ডের ক্লাস শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর পিয়ন নোটিশ বই নিয়ে ক্লাসে আসলে শ্রেণি শিক্ষক নোটিশ পড়ে শোনালেন, অনিবার্য কারণবশত: স্কুল ছুটি দেওয়া হলো। স্কুল থেকে বের হয়ে দেখলাম রাস্তায় লোকে লোকারণ্য। রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা খুবই কম। লোকজন পায়ে হেঁটে যে যার গন্তব্যে যা”েছ। আমি বাসে করে স্কুলে যাওয়া আসা করতাম। কোন যানবাহন না পেয়ে বাসার দিকে হাঁটা শুরু করলাম। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের কাছাকাছি এসে মোহাম্মদপুর টু গুলিস্তানগামী একটা বাস পেয়ে উঠে পড়ি। নিউমার্কেট পার হয়ে নীলক্ষেতে এসে দেখলাম ছাত্র, শ্রমিক ও জনতা লাঠিসোটা হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে শ্লোগান দি”েছ Ñ তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। বীর বাঙালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। লোকমুখে শুনলাম ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ১৯৭১ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য ¯’গিত ঘোষণা করেন। বাসায় আসার পথে দেখলাম অসংখ্য মিছিল। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ¯’গিত করায় ছাত্র, শ্রমিক জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বাসায় এসে শুনি দুপুরে জাতীয় সংসদের অধিবেশ ¯’গিত ঘোষণা করায় ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান টিমের সাথে কমনওয়েলথ টিমের ক্রিকেট খেলা চলাকালীন সময়ে দর্শকেরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। গ্যালারীতে ভাঙচুর করে, আগুন ধরিয়ে দেয়। এ বিক্ষোভ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমি তখন ধানমন্ডি গভঃ বয়েজ হাইস্কুলের ছাত্র। আমি আমার পরম শ্রদ্ধেয় জেঠা মরহুম সুলতান আহমদ এর বাসা “চামেলী হাউস” (বর্তামন সিরডাপ মিলনায়তন) ১৭, তোপখানা রোডের দোতলায় থাকতাম। আমার জেঠা তখন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন। স্বাধীনতার পরে অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন টিমের সদস্য ছিলেন। আমি বাসে চড়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করতাম। তৎকালীন ইপিটিআরসি’র ১৫ নং রুটের বাস গুলিস্তান থেকে ছেড়ে প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে পলাশী, নিউমার্কেট, আসাদ গেইট হয়ে মিরপুর এবং ১২ নং রুটের বাস গুলিস্তান থেকে ছেড়ে প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে শাহবাগ, ফামগেইট, আসাদ গেট (তৎকালীন আইয়ুব গেইট) হয়ে মিরপুর যেত। ২ ও ৫ নং রুটের বাস গুলিস্তান থেকে ছেড়ে প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে পলাশী, নিউমার্কেট, আগাদ গেইট হয়ে যথাক্রমে মোহাম্মদুর ও মিরপুর যেত। আমি প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে বাসে উঠে ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে স্কুলে পৌঁছে যেতাম। ১২ ও ১৫ নং রুটের বাস ভাড়া ০.১৮ পয়সা এবং ২ ও ৫ নং রুটের বাস ভাড়া ০.১৫ পয়সা ছিল। ছাত্রদের আইডি কার্ড দেখালে ০.১০ পযৃসা ভাড়া নেওয়া হতো। পরদিন ২ মার্চ ১৯৭১ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাসার সামনে মাঠে পাকিস্তানি সেনাবাহিনি তাঁবু খাটিয়ে ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অব¯’ান নেয়। সম্ভাব্য বিপদ আঁচ করতে পেরে আমার জেঠা পরদিন ৩ মার্চ হরতালের মধ্যে ইস্কাটন¯’ নাসিমন বিল্ডিংয়ের নীচ তলায় বাসা বদল করেন। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, ক্লাস হ”েছ না। পড়ালেখায় মন বসে না। বাসায় অজানা আশংকায় দিন কাটছে। ঢাকা শহর মিছিল মিটিংয়ের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ৭ মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ঘোষণা করেনÑ “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” বযসে ছোট হওয়ার কারণে সে ঐতিহাসিক জনসভায় যেতে পারিনি। পরদনি ৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। পত্রিকা পড়ে, রেডিওতে খবর শুনে বাসায় অলস সময় কাটে। আমি মা-বাবার অতি আদরের ছোট ছেলে। দেশের এ অব¯’ায় আমার দাদি, মা-বাবা, ভাইবোন আমার জন্য খুবই চিন্তিত ছিল। সার্বিক পরিবেশ, পরি¯ি’তি বিবেচনা করে আমার জেঠা আমাকে মার্চ/৭১ মাসের তৃতীয় সপ্তাহের প্রথমদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এ.জেড.এম নাসির উদ্দিন সাহেবের আত্মীয়দের সাথে চট্টগ্রাম শহরে পাঠিয়ে দেন। আমি চট্টগ্রাম শহরে এসে রাঙ্গুনীয়ায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত এমপি জনাব ডাঃ ক্যান্টেন আবুল কাসেম সাহেবের দেওয়ানজি পুকুর পাড়ের বাসায় রাত্রিযাপন করি। পরদিন সকালে চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নরত আমার মেজোভাই মোঃ নাজিম উদ্দিন এর সাথে দেখা করার জন্য শেরে বাংলা হোস্টেলে যাই। কিš‘ সেখানে ওনার দেখা পাইনি। ঐদিন বিকালে ডাঃ ক্যাপ্টেন আবুল কাসেম সাহেবের সাথে শান্তিনিকেতন পর্যন্ত যাই এবং শান্তিনিকেতন থেকে রিক্সাযোগে সন্ধ্যার আগে বাড়িতে পৌঁছি। বাড়িতে যাওয়ার পরে আমাকে পেয়ে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন এবং চিন্তামুক্ত হন। ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে ঢাকা শহরে পাকিস্তানি সেবাবাহিনী ঠান্ডা মাথায় নৃশংসভাবে নিরস্ত্র, নিরপরাধ ও ঘুমন্ত বাঙালীর উপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ অব¯’ায় মানুষ আতংকিত হয়ে পড়ে। শহর থেকে মানুষ দলে দলে গ্রামে চলে আসতে থাকে। খুব সম্ভবত: ২৬ অথবা ২৭ মার্চ, ১৯৭১ সর্বজনাব বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম, রাঙ্গুনীয়া থানা কমান্ডার, প্রাক্তন এডিশনাল আইজিপি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ছালেহ আহমেদ সাহেবসহ আরো কয়েকজন আমাদের বাড়িতে এসে অব¯’ান নেন। আমাদের বাড়িটা রাস্তার সংলগ্ন হওয়ায় আমাদের বাড়িতে থাকা নিরাপদ বোধ না হওয়ায় ওনারা দু’এক দিন পর পারুয়ায় আমাদের ফুফাতো ভাই নুরুল আলম ভাইদের বাড়িতে চলে যান। নুরুল আলম ভাইও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। খুব সম্ভবত: জুলাই/৭১ মাসের শেষের দিকে আমাদের মেজো ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নাজিম উদ্দিনকে চট্টগ্রাম কলেজের শেরে বাংলা হোস্টেল থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী দোসররা ধরে নিয়ে যায়। তিনি চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। আমার বাবা মেজো ভাইয়ের খোঁজে প্রতিদিন সকালে চট্টগ্রাম শহরে যেতেন এবং অনেক রাতে বাড়িতে ফিরতেন। অবশেষে অনেক চেষ্টা তদবিরের ফলশ্রুতিতে ১৪ আগস্ট ১৯৭১ পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে সাধারণ ক্ষমায় মেজো ভাই মুক্তি লাভ করেন। এর কিছুদিন পরে তিনি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যান। বীর মুক্তিযোদ্ধারা ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে রাঙ্গুনীয়ায় আসলে পরি¯ি’তি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। রাতে ঘুম থেকে জেগে দেখতাম পরিচিত, অপরিচিত অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে। আমার মা অসু¯’ শরীর নিয়ে রাত জেগে মাতৃ¯েœহে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রান্নাবান্না করে খাওয়াতেন। মাকে আমার বড়ো বোন নুরজাহান বেগম সহযোগিতা করতেন। গোপনীয়তার জন্য কাজের মেয়েকে ডাকা হতো না। আমিও রান্নাঘর থেকে খাবার দাবার, চা, নাস্তা আনার কাজে সহযোগিতা করেছি। কয়েকজন ¯’ানীয় মুক্তিযোদ্ধা আমাদের বাড়িতে এসে চাল, তরিতরকারি নিয়ে যেতেন। রাণীরহাটে অপারেশনের সময় একজন মুক্তিযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হলে ওনাকে আমাদের বাড়িতে চিকিৎসা করেন আমাদের ফুফাতো ভাই মরহুম ডাঃ আবুর কাসেম। আমাদের বড়ো ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শামশুদ্দিন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আমার বাবা দেশ মাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে জীবন বাজি রেখে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সব ধরণের সহযোগিতা প্রদান করেন। আমাদের দুই ভাইয়ের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য, সহযোগিতা করার কারণে আমাদের বাবা মরহুম সফিউল আহম্মদ তালুকদারকে তৎকালীন রাঙ্গুনীয়া থানার ওসি বেশ কয়েকবার থানায় ডেকে নিয়ে যান। আমরা অজানা আশংকায় দুরুদুরু বুকে বাবার অপেক্ষায় থাকতাম। আমার মা, দাদি খাওয়া-দাওয়া করতেন না। বাবা ফিরে না আসা পর্যন্ত দাদি জায়নামাজে বসে থাকতেন। তখন স্কুল বন্ধ থাকায় পড়ালেখাও বন্ধ ছিল। বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকা এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবর শুনার জন্য আমরা গভীর আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করতাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠান বিশেষ করে “চরম পত্র”, “জল্লাদের দরবার” মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী বাঙালীদের ভীষণভাবে উজ্জীবিত করতো। আমিও পারুয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা ইফতেখার হোসেন এর ছোট ভাই আমার সহপাঠী বন্ধু আলমগীর হোসেন আমাদের প্রিয় বিদ্যাপীঠ রাঙ্গুনীয়া খিলমোগল রসিক উ”চ বিদ্যালয়ের দেয়ালেÑ “এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে”। “সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী”। “বাংলার মায়েরা, মেয়েরা সবাই মুক্তিবাহিনী”Ñ প্রভৃতি পোষ্টার অত্যন্ত দুঃসাহস করে লাগিয়েছি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের দোসরদের সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যকারী, সহযোগিতাকারীদের বাড়িঘর লুটপাট করছে, অগ্নিসংযোগ করছে। নিরীহ মানুষদের নির্বিচারে গুলি করে মারছে। সে আশংকায় আমরা সব সময় আতংকের মধ্যে ছিলাম। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) আত্মসমর্পন করে। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে এ বিজয় অর্জিত হয়। এ বিজয় অনেক আনন্দের, অনেক বেদনার। ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ আমাদের এবং আশেপাশের গ্রামের সব মুক্তিযোদ্ধা ফিরে আসে। শুধু ফিরে আসেন নাই আমাদের মেজো ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নাজিম উদ্দিন। বীর মুক্তিযোদ্ধারা রাঙ্গুনীয়া থানায় এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী রাঙ্গুনীয়া কলেজে অব¯’ান নেয়। দু’একদিন পরে মেজো ভাই ভারতীয় বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে বিকালে রাঙ্গুনীয়া কলেজ মাঠে নামেন। ঐদিন রাতে তিনি আমাদের বাড়িতে আসেন। ওনাকে দেখে আমি চিনতে পারিনি। মাথায় লম্বা চুল, মুখ ভর্তি দাড়ি, জলপাই রংয়ের ভারি শার্ট-প্যান্ট, পায়ে বুট, কাঁধে এসএমজি/ স্টেনগান। উনি আমাকে জড়িয়ে ধরার পরে ওনাকে চিনতে পারি। মেজো ভাই ফিরে আসার পরে আমরা বিজয়ের আনন্দে শরীক হই। কিছুদিন পরে ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী শরণার্থীরা দেশে ফিরে আসতে শুরু করে। শুরু হয় ধ্বংস প্রাপ্ত দেশ বিনির্মাণের কাজ। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা আমার তোমাদের ভুলবো না আমরা তোমাদের ভুলবো না … [বি:দ্র:- এ লেখাটি সম্পূর্ণ স্মৃতি থেকে লেখা, মুক্তিযুদ্ধ একটি খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। তথ্যগত কোন ভুল থাকলে তা অনি”ছাকৃত। এজন্য দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।] স্মৃতিতে একাত্তর মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত) উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক মুক্তি সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পাকিস্তানের ক্ষমতায় থাকা আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটে এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। ২৪ মার্চ ১৯৬৯ আইয়ুব খান তৎকালীন পাকিস্তানি সেনা প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানকে চিঠি লিখে ক্ষমতা গ্রহণের আহ্বান জানান। জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহণের পর ২৮ নভেম্বর ১৯৬৯ ঘোষণা করেন, যত শীঘ্র সম্ভব তিনি প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের শাসনামলে ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে। বাকি ২টি আসনে জয়লাভ করেন সর্বজনাব নূরুল আমিন ও চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়। অপর দিকে পশ্চিম পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ১৩৮টি আসনে জয়লাভ করে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পি.পি.পি)। প্রাদেশিক পরিষদের অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করে। জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে রাঙ্গুনীয়া, রাউজান ও হাটহাজারী আসনে মরহুম এম. এ. ইদ্রিস এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মরহুম ডাঃ ক্যাপ্টেইন আবুল কাশেম জয়লাভ করেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনে রাঙ্গুনীয়ায় আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে এবং নির্বাচনে জয়লাভে হাতেগোনা যে কয়েকজন সক্রিয়া ভূমিকা পালন করেন, তাঁদের মধ্যে আমার বাবা মরহুম সফিউল আহমদ তালুকদার, প্রাক্তন চেয়ারম্যান, হোসনাবাদ ইউপি একজন ছিলেন। পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের াকছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। ১ মার্চ ১৯৭১ আমি সেদিন যথারীতি স্কুলে গিয়েছি। টিফিন পিরিয়ডের পরে ৫ম পিরিয়ডের ক্লাস শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর পিয়ন নোটিশ বই নিয়ে ক্লাসে আসলে শ্রেণি শিক্ষক নোটিশ পড়ে শোনালেন, অনিবার্য কারণবশত: স্কুল ছুটি দেওয়া হলো। স্কুল থেকে বের হয়ে দেখলাম রাস্তায় লোকে লোকারণ্য। রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা খুবই কম। লোকজন পায়ে হেঁটে যে যার গন্তব্যে যা”েছ। আমি বাসে করে স্কুলে যাওয়া আসা করতাম। কোন যানবাহন না পেয়ে বাসার দিকে হাঁটা শুরু করলাম। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের কাছাকাছি এসে মোহাম্মদপুর টু গুলিস্তানগামী একটা বাস পেয়ে উঠে পড়ি। নিউমার্কেট পার হয়ে নীলক্ষেতে এসে দেখলাম ছাত্র, শ্রমিক ও জনতা লাঠিসোটা হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে শ্লোগান দি”েছ Ñ তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। বীর বাঙালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। লোকমুখে শুনলাম ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ১৯৭১ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য ¯’গিত ঘোষণা করেন। বাসায় আসার পথে দেখলাম অসংখ্য মিছিল। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ¯’গিত করায় ছাত্র, শ্রমিক জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বাসায় এসে শুনি দুপুরে জাতীয় সংসদের অধিবেশ ¯’গিত ঘোষণা করায় ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান টিমের সাথে কমনওয়েলথ টিমের ক্রিকেট খেলা চলাকালীন সময়ে দর্শকেরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। গ্যালারীতে ভাঙচুর করে, আগুন ধরিয়ে দেয়। এ বিক্ষোভ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমি তখন ধানমন্ডি গভঃ বয়েজ হাইস্কুলের ছাত্র। আমি আমার পরম শ্রদ্ধেয় জেঠা মরহুম সুলতান আহমদ এর বাসা “চামেলী হাউস” (বর্তামন সিরডাপ মিলনায়তন) ১৭, তোপখানা রোডের দোতলায় থাকতাম। আমার জেঠা তখন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন। স্বাধীনতার পরে অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন টিমের সদস্য ছিলেন। আমি বাসে চড়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করতাম। তৎকালীন ইপিটিআরসি’র ১৫ নং রুটের বাস গুলিস্তান থেকে ছেড়ে প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে পলাশী, নিউমার্কেট, আসাদ গেইট হয়ে মিরপুর এবং ১২ নং রুটের বাস গুলিস্তান থেকে ছেড়ে প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে শাহবাগ, ফামগেইট, আসাদ গেট (তৎকালীন আইয়ুব গেইট) হয়ে মিরপুর যেত। ২ ও ৫ নং রুটের বাস গুলিস্তান থেকে ছেড়ে প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে পলাশী, নিউমার্কেট, আগাদ গেইট হয়ে যথাক্রমে মোহাম্মদুর ও মিরপুর যেত। আমি প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে বাসে উঠে ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে স্কুলে পৌঁছে যেতাম। ১২ ও ১৫ নং রুটের বাস ভাড়া ০.১৮ পয়সা এবং ২ ও ৫ নং রুটের বাস ভাড়া ০.১৫ পয়সা ছিল। ছাত্রদের আইডি কার্ড দেখালে ০.১০ পযৃসা ভাড়া নেওয়া হতো। পরদিন ২ মার্চ ১৯৭১ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাসার সামনে মাঠে পাকিস্তানি সেনাবাহিনি তাঁবু খাটিয়ে ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অব¯’ান নেয়। সম্ভাব্য বিপদ আঁচ করতে পেরে আমার জেঠা পরদিন ৩ মার্চ হরতালের মধ্যে ইস্কাটন¯’ নাসিমন বিল্ডিংয়ের নীচ তলায় বাসা বদল করেন। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, ক্লাস হ”েছ না। পড়ালেখায় মন বসে না। বাসায় অজানা আশংকায় দিন কাটছে। ঢাকা শহর মিছিল মিটিংয়ের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ৭ মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ঘোষণা করেনÑ “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” বযসে ছোট হওয়ার কারণে সে ঐতিহাসিক জনসভায় যেতে পারিনি। পরদনি ৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। পত্রিকা পড়ে, রেডিওতে খবর শুনে বাসায় অলস সময় কাটে। আমি মা-বাবার অতি আদরের ছোট ছেলে। দেশের এ অব¯’ায় আমার দাদি, মা-বাবা, ভাইবোন আমার জন্য খুবই চিন্তিত ছিল। সার্বিক পরিবেশ, পরি¯ি’তি বিবেচনা করে আমার জেঠা আমাকে মার্চ/৭১ মাসের তৃতীয় সপ্তাহের প্রথমদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এ.জেড.এম নাসির উদ্দিন সাহেবের আত্মীয়দের সাথে চট্টগ্রাম শহরে পাঠিয়ে দেন। আমি চট্টগ্রাম শহরে এসে রাঙ্গুনীয়ায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত এমপি জনাব ডাঃ ক্যান্টেন আবুল কাসেম সাহেবের দেওয়ানজি পুকুর পাড়ের বাসায় রাত্রিযাপন করি। পরদিন সকালে চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নরত আমার মেজোভাই মোঃ নাজিম উদ্দিন এর সাথে দেখা করার জন্য শেরে বাংলা হোস্টেলে যাই। কিš‘ সেখানে ওনার দেখা পাইনি। ঐদিন বিকালে ডাঃ ক্যাপ্টেন আবুল কাসেম সাহেবের সাথে শান্তিনিকেতন পর্যন্ত যাই এবং শান্তিনিকেতন থেকে রিক্সাযোগে সন্ধ্যার আগে বাড়িতে পৌঁছি। বাড়িতে যাওয়ার পরে আমাকে পেয়ে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন এবং চিন্তামুক্ত হন। ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে ঢাকা শহরে পাকিস্তানি সেবাবাহিনী ঠান্ডা মাথায় নৃশংসভাবে নিরস্ত্র, নিরপরাধ ও ঘুমন্ত বাঙালীর উপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ অব¯’ায় মানুষ আতংকিত হয়ে পড়ে। শহর থেকে মানুষ দলে দলে গ্রামে চলে আসতে থাকে। খুব সম্ভবত: ২৬ অথবা ২৭ মার্চ, ১৯৭১ সর্বজনাব বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম, রাঙ্গুনীয়া থানা কমান্ডার, প্রাক্তন এডিশনাল আইজিপি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ছালেহ আহমেদ সাহেবসহ আরো কয়েকজন আমাদের বাড়িতে এসে অব¯’ান নেন। আমাদের বাড়িটা রাস্তার সংলগ্ন হওয়ায় আমাদের বাড়িতে থাকা নিরাপদ বোধ না হওয়ায় ওনারা দু’এক দিন পর পারুয়ায় আমাদের ফুফাতো ভাই নুরুল আলম ভাইদের বাড়িতে চলে যান। নুরুল আলম ভাইও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। খুব সম্ভবত: জুলাই/৭১ মাসের শেষের দিকে আমাদের মেজো ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নাজিম উদ্দিনকে চট্টগ্রাম কলেজের শেরে বাংলা হোস্টেল থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী দোসররা ধরে নিয়ে যায়। তিনি চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। আমার বাবা মেজো ভাইয়ের খোঁজে প্রতিদিন সকালে চট্টগ্রাম শহরে যেতেন এবং অনেক রাতে বাড়িতে ফিরতেন। অবশেষে অনেক চেষ্টা তদবিরের ফলশ্রুতিতে ১৪ আগস্ট ১৯৭১ পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে সাধারণ ক্ষমায় মেজো ভাই মুক্তি লাভ করেন। এর কিছুদিন পরে তিনি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যান। বীর মুক্তিযোদ্ধারা ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে রাঙ্গুনীয়ায় আসলে পরি¯ি’তি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। রাতে ঘুম থেকে জেগে দেখতাম পরিচিত, অপরিচিত অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে। আমার মা অসু¯’ শরীর নিয়ে রাত জেগে মাতৃ¯েœহে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রান্নাবান্না করে খাওয়াতেন। মাকে আমার বড়ো বোন নুরজাহান বেগম সহযোগিতা করতেন। গোপনীয়তার জন্য কাজের মেয়েকে ডাকা হতো না। আমিও রান্নাঘর থেকে খাবার দাবার, চা, নাস্তা আনার কাজে সহযোগিতা করেছি। কয়েকজন ¯’ানীয় মুক্তিযোদ্ধা আমাদের বাড়িতে এসে চাল, তরিতরকারি নিয়ে যেতেন। রাণীরহাটে অপারেশনের সময় একজন মুক্তিযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হলে ওনাকে আমাদের বাড়িতে চিকিৎসা করেন আমাদের ফুফাতো ভাই মরহুম ডাঃ আবুর কাসেম। আমাদের বড়ো ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শামশুদ্দিন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আমার বাবা দেশ মাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে জীবন বাজি রেখে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সব ধরণের সহযোগিতা প্রদান করেন। আমাদের দুই ভাইয়ের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য, সহযোগিতা করার কারণে আমাদের বাবা মরহুম সফিউল আহম্মদ তালুকদারকে তৎকালীন রাঙ্গুনীয়া থানার ওসি বেশ কয়েকবার থানায় ডেকে নিয়ে যান। আমরা অজানা আশংকায় দুরুদুরু বুকে বাবার অপেক্ষায় থাকতাম। আমার মা, দাদি খাওয়া-দাওয়া করতেন না। বাবা ফিরে না আসা পর্যন্ত দাদি জায়নামাজে বসে থাকতেন। তখন স্কুল বন্ধ থাকায় পড়ালেখাও বন্ধ ছিল। বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকা এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবর শুনার জন্য আমরা গভীর আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করতাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠান বিশেষ করে “চরম পত্র”, “জল্লাদের দরবার” মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী বাঙালীদের ভীষণভাবে উজ্জীবিত করতো। আমিও পারুয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা ইফতেখার হোসেন এর ছোট ভাই আমার সহপাঠী বন্ধু আলমগীর হোসেন আমাদের প্রিয় বিদ্যাপীঠ রাঙ্গুনীয়া খিলমোগল রসিক উ”চ বিদ্যালয়ের দেয়ালেÑ “এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে”। “সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী”। “বাংলার মায়েরা, মেয়েরা সবাই মুক্তিবাহিনী”Ñ প্রভৃতি পোষ্টার অত্যন্ত দুঃসাহস করে লাগিয়েছি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের দোসরদের সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যকারী, সহযোগিতাকারীদের বাড়িঘর লুটপাট করছে, অগ্নিসংযোগ করছে। নিরীহ মানুষদের নির্বিচারে গুলি করে মারছে। সে আশংকায় আমরা সব সময় আতংকের মধ্যে ছিলাম। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) আত্মসমর্পন করে। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে এ বিজয় অর্জিত হয়। এ বিজয় অনেক আনন্দের, অনেক বেদনার। ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ আমাদের এবং আশেপাশের গ্রামের সব মুক্তিযোদ্ধা ফিরে আসে। শুধু ফিরে আসেন নাই আমাদের মেজো ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নাজিম উদ্দিন। বীর মুক্তিযোদ্ধারা রাঙ্গুনীয়া থানায় এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী রাঙ্গুনীয়া কলেজে অব¯’ান নেয়। দু’একদিন পরে মেজো ভাই ভারতীয় বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে বিকালে রাঙ্গুনীয়া কলেজ মাঠে নামেন। ঐদিন রাতে তিনি আমাদের বাড়িতে আসেন। ওনাকে দেখে আমি চিনতে পারিনি। মাথায় লম্বা চুল, মুখ ভর্তি দাড়ি, জলপাই রংয়ের ভারি শার্ট-প্যান্ট, পায়ে বুট, কাঁধে এসএমজি/ স্টেনগান। উনি আমাকে জড়িয়ে ধরার পরে ওনাকে চিনতে পারি। মেজো ভাই ফিরে আসার পরে আমরা বিজয়ের আনন্দে শরীক হই। কিছুদিন পরে ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী শরণার্থীরা দেশে ফিরে আসতে শুরু করে। শুরু হয় ধ্বংস প্রাপ্ত দেশ বিনির্মাণের কাজ। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা আমার তোমাদের ভুলবো না আমরা তোমাদের ভুলবো না … [বি:দ্র:- এ লেখাটি সম্পূর্ণ স্মৃতি থেকে লেখা, মুক্তিযুদ্ধ একটি খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। তথ্যগত কোন ভুল থাকলে তা অনি”ছাকৃত। এজন্য দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।] স্মৃতিতে একাত্তর মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত) উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক মুক্তি সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পাকিস্তানের ক্ষমতায় থাকা আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটে এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। ২৪ মার্চ ১৯৬৯ আইয়ুব খান তৎকালীন পাকিস্তানি সেনা প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানকে চিঠি লিখে ক্ষমতা গ্রহণের আহ্বান জানান। জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহণের পর ২৮ নভেম্বর ১৯৬৯ ঘোষণা করেন, যত শীঘ্র সম্ভব তিনি প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের শাসনামলে ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে। বাকি ২টি আসনে জয়লাভ করেন সর্বজনাব নূরুল আমিন ও চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়। অপর দিকে পশ্চিম পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ১৩৮টি আসনে জয়লাভ করে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পি.পি.পি)। প্রাদেশিক পরিষদের অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করে। জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে রাঙ্গুনীয়া, রাউজান ও হাটহাজারী আসনে মরহুম এম. এ. ইদ্রিস এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মরহুম ডাঃ ক্যাপ্টেইন আবুল কাশেম জয়লাভ করেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনে রাঙ্গুনীয়ায় আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে এবং নির্বাচনে জয়লাভে হাতেগোনা যে কয়েকজন সক্রিয়া ভূমিকা পালন করেন, তাঁদের মধ্যে আমার বাবা মরহুম সফিউল আহমদ তালুকদার, প্রাক্তন চেয়ারম্যান, হোসনাবাদ ইউপি একজন ছিলেন। পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের াকছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। ১ মার্চ ১৯৭১ আমি সেদিন যথারীতি স্কুলে গিয়েছি। টিফিন পিরিয়ডের পরে ৫ম পিরিয়ডের ক্লাস শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর পিয়ন নোটিশ বই নিয়ে ক্লাসে আসলে শ্রেণি শিক্ষক নোটিশ পড়ে শোনালেন, অনিবার্য কারণবশত: স্কুল ছুটি দেওয়া হলো। স্কুল থেকে বের হয়ে দেখলাম রাস্তায় লোকে লোকারণ্য। রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা খুবই কম। লোকজন পায়ে হেঁটে যে যার গন্তব্যে যা”েছ। আমি বাসে করে স্কুলে যাওয়া আসা করতাম। কোন যানবাহন না পেয়ে বাসার দিকে হাঁটা শুরু করলাম। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের কাছাকাছি এসে মোহাম্মদপুর টু গুলিস্তানগামী একটা বাস পেয়ে উঠে পড়ি। নিউমার্কেট পার হয়ে নীলক্ষেতে এসে দেখলাম ছাত্র, শ্রমিক ও জনতা লাঠিসোটা হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে শ্লোগান দি”েছ Ñ তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। বীর বাঙালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। লোকমুখে শুনলাম ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ১৯৭১ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য ¯’গিত ঘোষণা করেন। বাসায় আসার পথে দেখলাম অসংখ্য মিছিল। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ¯’গিত করায় ছাত্র, শ্রমিক জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বাসায় এসে শুনি দুপুরে জাতীয় সংসদের অধিবেশ ¯’গিত ঘোষণা করায় ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান টিমের সাথে কমনওয়েলথ টিমের ক্রিকেট খেলা চলাকালীন সময়ে দর্শকেরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। গ্যালারীতে ভাঙচুর করে, আগুন ধরিয়ে দেয়। এ বিক্ষোভ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমি তখন ধানমন্ডি গভঃ বয়েজ হাইস্কুলের ছাত্র। আমি আমার পরম শ্রদ্ধেয় জেঠা মরহুম সুলতান আহমদ এর বাসা “চামেলী হাউস” (বর্তামন সিরডাপ মিলনায়তন) ১৭, তোপখানা রোডের দোতলায় থাকতাম। আমার জেঠা তখন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন। স্বাধীনতার পরে অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন টিমের সদস্য ছিলেন। আমি বাসে চড়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করতাম। তৎকালীন ইপিটিআরসি’র ১৫ নং রুটের বাস গুলিস্তান থেকে ছেড়ে প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে পলাশী, নিউমার্কেট, আসাদ গেইট হয়ে মিরপুর এবং ১২ নং রুটের বাস গুলিস্তান থেকে ছেড়ে প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে শাহবাগ, ফামগেইট, আসাদ গেট (তৎকালীন আইয়ুব গেইট) হয়ে মিরপুর যেত। ২ ও ৫ নং রুটের বাস গুলিস্তান থেকে ছেড়ে প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে পলাশী, নিউমার্কেট, আগাদ গেইট হয়ে যথাক্রমে মোহাম্মদুর ও মিরপুর যেত। আমি প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে বাসে উঠে ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে স্কুলে পৌঁছে যেতাম। ১২ ও ১৫ নং রুটের বাস ভাড়া ০.১৮ পয়সা এবং ২ ও ৫ নং রুটের বাস ভাড়া ০.১৫ পয়সা ছিল। ছাত্রদের আইডি কার্ড দেখালে ০.১০ পযৃসা ভাড়া নেওয়া হতো। পরদিন ২ মার্চ ১৯৭১ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাসার সামনে মাঠে পাকিস্তানি সেনাবাহিনি তাঁবু খাটিয়ে ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অব¯’ান নেয়। সম্ভাব্য বিপদ আঁচ করতে পেরে আমার জেঠা পরদিন ৩ মার্চ হরতালের মধ্যে ইস্কাটন¯’ নাসিমন বিল্ডিংয়ের নীচ তলায় বাসা বদল করেন। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, ক্লাস হ”েছ না। পড়ালেখায় মন বসে না। বাসায় অজানা আশংকায় দিন কাটছে। ঢাকা শহর মিছিল মিটিংয়ের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ৭ মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ঘোষণা করেনÑ “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” বযসে ছোট হওয়ার কারণে সে ঐতিহাসিক জনসভায় যেতে পারিনি। পরদনি ৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। পত্রিকা পড়ে, রেডিওতে খবর শুনে বাসায় অলস সময় কাটে। আমি মা-বাবার অতি আদরের ছোট ছেলে। দেশের এ অব¯’ায় আমার দাদি, মা-বাবা, ভাইবোন আমার জন্য খুবই চিন্তিত ছিল। সার্বিক পরিবেশ, পরি¯ি’তি বিবেচনা করে আমার জেঠা আমাকে মার্চ/৭১ মাসের তৃতীয় সপ্তাহের প্রথমদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এ.জেড.এম নাসির উদ্দিন সাহেবের আত্মীয়দের সাথে চট্টগ্রাম শহরে পাঠিয়ে দেন। আমি চট্টগ্রাম শহরে এসে রাঙ্গুনীয়ায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত এমপি জনাব ডাঃ ক্যান্টেন আবুল কাসেম সাহেবের দেওয়ানজি পুকুর পাড়ের বাসায় রাত্রিযাপন করি। পরদিন সকালে চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নরত আমার মেজোভাই মোঃ নাজিম উদ্দিন এর সাথে দেখা করার জন্য শেরে বাংলা হোস্টেলে যাই। কিš‘ সেখানে ওনার দেখা পাইনি। ঐদিন বিকালে ডাঃ ক্যাপ্টেন আবুল কাসেম সাহেবের সাথে শান্তিনিকেতন পর্যন্ত যাই এবং শান্তিনিকেতন থেকে রিক্সাযোগে সন্ধ্যার আগে বাড়িতে পৌঁছি। বাড়িতে যাওয়ার পরে আমাকে পেয়ে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন এবং চিন্তামুক্ত হন। ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে ঢাকা শহরে পাকিস্তানি সেবাবাহিনী ঠান্ডা মাথায় নৃশংসভাবে নিরস্ত্র, নিরপরাধ ও ঘুমন্ত বাঙালীর উপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ অব¯’ায় মানুষ আতংকিত হয়ে পড়ে। শহর থেকে মানুষ দলে দলে গ্রামে চলে আসতে থাকে। খুব সম্ভবত: ২৬ অথবা ২৭ মার্চ, ১৯৭১ সর্বজনাব বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম, রাঙ্গুনীয়া থানা কমান্ডার, প্রাক্তন এডিশনাল আইজিপি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ছালেহ আহমেদ সাহেবসহ আরো কয়েকজন আমাদের বাড়িতে এসে অব¯’ান নেন। আমাদের বাড়িটা রাস্তার সংলগ্ন হওয়ায় আমাদের বাড়িতে থাকা নিরাপদ বোধ না হওয়ায় ওনারা দু’এক দিন পর পারুয়ায় আমাদের ফুফাতো ভাই নুরুল আলম ভাইদের বাড়িতে চলে যান। নুরুল আলম ভাইও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। খুব সম্ভবত: জুলাই/৭১ মাসের শেষের দিকে আমাদের মেজো ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নাজিম উদ্দিনকে চট্টগ্রাম কলেজের শেরে বাংলা হোস্টেল থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী দোসররা ধরে নিয়ে যায়। তিনি চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। আমার বাবা মেজো ভাইয়ের খোঁজে প্রতিদিন সকালে চট্টগ্রাম শহরে যেতেন এবং অনেক রাতে বাড়িতে ফিরতেন। অবশেষে অনেক চেষ্টা তদবিরের ফলশ্রুতিতে ১৪ আগস্ট ১৯৭১ পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে সাধারণ ক্ষমায় মেজো ভাই মুক্তি লাভ করেন। এর কিছুদিন পরে তিনি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যান। বীর মুক্তিযোদ্ধারা ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে রাঙ্গুনীয়ায় আসলে পরি¯ি’তি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। রাতে ঘুম থেকে জেগে দেখতাম পরিচিত, অপরিচিত অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে। আমার মা অসু¯’ শরীর নিয়ে রাত জেগে মাতৃ¯েœহে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রান্নাবান্না করে খাওয়াতেন। মাকে আমার বড়ো বোন নুরজাহান বেগম সহযোগিতা করতেন। গোপনীয়তার জন্য কাজের মেয়েকে ডাকা হতো না। আমিও রান্নাঘর থেকে খাবার দাবার, চা, নাস্তা আনার কাজে সহযোগিতা করেছি। কয়েকজন ¯’ানীয় মুক্তিযোদ্ধা আমাদের বাড়িতে এসে চাল, তরিতরকারি নিয়ে যেতেন। রাণীরহাটে অপারেশনের সময় একজন মুক্তিযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হলে ওনাকে আমাদের বাড়িতে চিকিৎসা করেন আমাদের ফুফাতো ভাই মরহুম ডাঃ আবুর কাসেম। আমাদের বড়ো ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শামশুদ্দিন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আমার বাবা দেশ মাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে জীবন বাজি রেখে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সব ধরণের সহযোগিতা প্রদান করেন। আমাদের দুই ভাইয়ের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য, সহযোগিতা করার কারণে আমাদের বাবা মরহুম সফিউল আহম্মদ তালুকদারকে তৎকালীন রাঙ্গুনীয়া থানার ওসি বেশ কয়েকবার থানায় ডেকে নিয়ে যান। আমরা অজানা আশংকায় দুরুদুরু বুকে বাবার অপেক্ষায় থাকতাম। আমার মা, দাদি খাওয়া-দাওয়া করতেন না। বাবা ফিরে না আসা পর্যন্ত দাদি জায়নামাজে বসে থাকতেন। তখন স্কুল বন্ধ থাকায় পড়ালেখাও বন্ধ ছিল। বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকা এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবর শুনার জন্য আমরা গভীর আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করতাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠান বিশেষ করে “চরম পত্র”, “জল্লাদের দরবার” মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী বাঙালীদের ভীষণভাবে উজ্জীবিত করতো। আমিও পারুয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা ইফতেখার হোসেন এর ছোট ভাই আমার সহপাঠী বন্ধু আলমগীর হোসেন আমাদের প্রিয় বিদ্যাপীঠ রাঙ্গুনীয়া খিলমোগল রসিক উ”চ বিদ্যালয়ের দেয়ালেÑ “এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে”। “সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী”। “বাংলার মায়েরা, মেয়েরা সবাই মুক্তিবাহিনী”Ñ প্রভৃতি পোষ্টার অত্যন্ত দুঃসাহস করে লাগিয়েছি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের দোসরদের সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যকারী, সহযোগিতাকারীদের বাড়িঘর লুটপাট করছে, অগ্নিসংযোগ করছে। নিরীহ মানুষদের নির্বিচারে গুলি করে মারছে। সে আশংকায় আমরা সব সময় আতংকের মধ্যে ছিলাম। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) আত্মসমর্পন করে। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে এ বিজয় অর্জিত হয়। এ বিজয় অনেক আনন্দের, অনেক বেদনার। ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ আমাদের এবং আশেপাশের গ্রামের সব মুক্তিযোদ্ধা ফিরে আসে। শুধু ফিরে আসেন নাই আমাদের মেজো ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নাজিম উদ্দিন। বীর মুক্তিযোদ্ধারা রাঙ্গুনীয়া থানায় এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী রাঙ্গুনীয়া কলেজে অব¯’ান নেয়। দু’একদিন পরে মেজো ভাই ভারতীয় বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে বিকালে রাঙ্গুনীয়া কলেজ মাঠে নামেন। ঐদিন রাতে তিনি আমাদের বাড়িতে আসেন। ওনাকে দেখে আমি চিনতে পারিনি। মাথায় লম্বা চুল, মুখ ভর্তি দাড়ি, জলপাই রংয়ের ভারি শার্ট-প্যান্ট, পায়ে বুট, কাঁধে এসএমজি/ স্টেনগান। উনি আমাকে জড়িয়ে ধরার পরে ওনাকে চিনতে পারি। মেজো ভাই ফিরে আসার পরে আমরা বিজয়ের আনন্দে শরীক হই। কিছুদিন পরে ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী শরণার্থীরা দেশে ফিরে আসতে শুরু করে। শুরু হয় ধ্বংস প্রাপ্ত দেশ বিনির্মাণের কাজ। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা আমার তোমাদের ভুলবো না আমরা তোমাদের ভুলবো না … [বি:দ্র:- এ লেখাটি সম্পূর্ণ স্মৃতি থেকে লেখা, মুক্তিযুদ্ধ একটি খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। তথ্যগত কোন ভুল থাকলে তা অনি”ছাকৃত। এজন্য দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।
লেখক: প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত)


