১৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রচ্ছদসাহিত্যমুক্তিযুদ্ধে শিল্পী ও শিল্প

মুক্তিযুদ্ধে শিল্পী ও শিল্প

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের এক বড় অহংকার এবং স্মরণীয় অধ্যায়, যার পেছনে রয়েছে এক সংগ্রামী চেতনার গল্প/প্রতিচ্ছবি। স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং তা ক্ষুণœ হলেই জন্ম নেয় সংগ্রামী চেতনার- যার পেছনে থাকে আত্মমুক্তি ও আত্মবিকাশের আকাক্সক্ষা, লালিত স্বপ্ন। যে স্বপ্ন দেখেছিলেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্বপ্ন দেখেছিলেন এদেশের সর্বস্তরের মানুষ। স্বপ্নপূরণের যাত্রাটাই ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধ।

১৯৭১ সালে স্বদেশের প্রতি গভীর ভালবাসা ও শ্রদ্ধা সহকারে এগিয়ে আসে বাংলার দামাল ছেলেরা। ছাত্র, শ্রমিক, জনতা সবাই মিলে এগিয়ে আসে স্বাধীনতা নামক লালিত স্বপ্ন পূরণের জন্যে। যে যেভাবে পেরেছেন তার জায়গা থেকে অংশগ্রহণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধে। লেখক, গায়ক, কলামিস্ট, বুদ্ধিজীবী যার যার জায়গা থেকে অংশগ্রহণ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। সংগ্রাম পরিষদের গায়করা গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনাকে জাগ্রত করেছেন। তেমনি এদেশের চারুশিল্পী সমাজ এগিয়ে আসে মহান মুক্তিযুদ্ধের যোদ্ধা হিসেবে হাতে রং-তুলির অস্ত্র নিয়ে।

শিল্পী হিসেবে যোদ্ধার মতো যারা অনলস পরিশ্রম করেছেন তাঁরা হলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান, দেবদাস চক্রবর্তী, বীরেন সোম, আবুল বারাক আলভী, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, চন্দ্রশেখর, মুস্তাফা মনোয়ারসহ আরো অনেকে। তৎকালীন চারুশিল্পীগণ তাঁদের তুলির সঠিক ব্যবহার করেছিলেন দেশমাতৃকাকে বাঁচাতে। শুধু মুক্তিযুদ্ধেই নয়, দেশের যে কোনো আন্দোলন সংগ্রামে এগিয়ে এসেছিলেন আমাদের চারুশিল্পী সমাজ। শুধু সন্তান হিসেবেই নয়, বরং শিল্পী হিসেবে বিবেকের কাছে শিল্পের দায়ে। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের মতো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তাঁরা বারবার প্রমাণ করেছেন শিল্পীরা স্বপ্ন দেখায় রুচিশীল সুশীল সমাজের।

“কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, নেতা,

শিল্পী, সেনা, আমজনতা,

সবাই মিলে একসাথে,

গর্জে ওঠে যুদ্ধের মাঠে,

উদ্দেশ্য একটা- বাংলার স্বাধীনতা।”

এই স্বাধীনতা নামক সূর্য সন্তানকে প্রসব করতে আমাদের বাংলা মাকেও অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে দীর্ঘ ৯ মাস সকল গর্ভধারিণী মায়ের মতো। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে রক্ত খেয়েছে ঐ পৈশাচিক পাকিস্তানী নরপশুরা। ইজ্জত, সম্ভ্রম হরণ করেছে আমাদের মা ও বোনেদের। তাইতো ঘৃণা ও ক্ষোভে গুমরে ওঠা অকুতোভয় আমাদের যোদ্ধারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা যোগাতে যারা বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছিলেন তাদেরই একাংশ আমাদের চারুশিল্পিরা।

সত্তরের দশকের চিত্রশিল্পিরা তাদের তুলির আঁচড়ে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ইয়াহিয়া খানের মসনদ। শিল্পিদের ফেস্টুন, কার্টুন, ব্যানার, পোস্টার, ব্যঙ্গচিত্রগুলো যেন বন্দুক, রাইফেল, গ্রেনেড,কামান, বোমার মতো বিস্ফোরক হয়ে হাজির হয়েছিল পাকিস্তানীদের সামনে। আর সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মোহিনী মন্ত্র- “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” “তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।” মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় মোহিত পাগলপারা নির্ভীক বাঙালি জাতি তাদের পিতার আদেশে মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্তির লক্ষ্যে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন আর যারা তাদের প্রেরণা যুগিয়েছিলেন রং-তুলির আঁচড়ের মাধ্যমে তাঁদের মধ্যে অন্যতম শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন।

জয়নুল আবেদিন যুদ্ধের সময় দেশেই ছিলেন এবং শেষ পর্যায়ে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার সময় আত্মগোপন করে জীবন রক্ষা করেছিলেন।

যুদ্ধের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায়ও তাঁর তুলি থেমে যায়নি। এঁকে গেছেন একের পর এক চিত্র। তাঁর ‘শরণার্থী’ নামের ছবিতে দেখা যায় ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষের ঘরবাড়ি ছেড়ে সীমান্তের উদ্দেশ্যে চলে যাওয়ার চিত্র। মুক্তিযুদ্ধ চলকালীন পাক হানাদার বাহিনীর অমানুষিক নির্যাতন ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জীবন্ত চিত্র, বাংলার মানুষের অসহায়ত্বের নিখুঁত চিত্র ফুটে উঠেছে রং-তুলির মাধ্যমে। ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নামক স্কেচে ফুটে উঠেছে রাইফেল হাতে চোখে মুখে বিজয়ের দৃঢ় প্রত্যয়ে ক্ষিপ্র পদক্ষেপে মুক্তিযোদ্ধাদের এগিয়ে আসার চিত্র। বিজয়ের প্রেরণাদানকারী এই ছবিতে ঘৃণা ও শোকের প্রতীক হিসেবে তিনি মোটা ও কালো ব্রাশে আঁকেন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদানকারী শিল্পীদের মধ্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র পটুয়া কামরুল হাসান। তিনি অনুভব করেছিলেন একমাত্র একটি স্বাধীন রাষ্টীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালির সত্যিকারের মুক্তি সম্ভব। ১৯৭১-এর মার্চে স্বৈরাচারী শাসক ইয়াহিয়া খান যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হিটলারী কায়দায় গণহত্য শুরু করল, তখন তিনি উত্তপ্ত বেদনা আর ক্ষোভে জ্বলে উঠে ‘ইয়াহিয়া এই জানোয়ারটা আবার আক্রমণ করতে পারে’ শিরোনামে সদৃশ প্রতিকৃতি দিয়ে ১০ (দশ) টি পোস্টার আঁকেন। পোস্টারগুলি শহীদ মিনারে জনসাধারণের জন্য প্রদর্শন করা হয়। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে কামরুল হাসান পশ্চিমবঙ্গে চলে যান এবং নবগঠিত মুজিবনগর সরকারের তথ্য ও প্রচার বিভাগের প্রধান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন তিনি ইয়াহিয়া খানের প্রতিকৃতি দিয়ে একটি বিখ্যাত ব্যঙ্গচিত্র আঁকেন ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’ শিরোনামে। সেখানে দানব আকারে দেখানো হয় ইয়াহিয়াকে যা প্রকৃত অর্থে পুরো হানাদার বাহিনীর নগ্ন চরিত্রের পরিচয় বাহক। সেই চিত্রটি দিয়ে পোস্টার ছাপিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এই পোস্টার চিত্রটি পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনীর এবং তাদের এদেশীয় দালালদের বিরুদ্ধে অর্থাৎ রাজাকারদের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে ঘৃণা ও বিদ্রোহের উদ্রেক বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে। এ ধরনের আরও অনেক পোস্টার তিনি এঁকেছিলেন। তার এমন একটা পোস্টারের উপরিভাগে স্লোগান লেখা রয়েছে- ‘রক্তের ঋণ রক্তে শুধবো, দেশকে এবার মুক্ত করবো’। এছাড়াও ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব’, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো’, ‘মুক্তিবাহিনী আপনার পাশেই আছে’- বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও প্রচার দপ্তর থেকে প্রচার করা হয়। এগুলো প্রচ-ভাবে নাড়িয়ে দেয় বীর বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের।

পোস্টার ছাড়াও কামরুল হাসান যুদ্ধের সময় কালো কালির দ্বারা ‘মুক্তিযোদ্ধা রমণী’ শীর্ষক চিত্রকর্ম করেন। এতে তিনি বন্দুক হাতে বাঙালি নারীর সাহসিকতাকে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। এক হাতে কলসি আর অপর হাতে বন্দুক নিয়ে নারী প্রয়োজনে কতটা ঝুঁকি নিতে পারে তা তিনি দেখাতে গিয়ে বাঙালি নারীদের যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ হওয়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের কবিতায় সদৃশ চিত্র ‘এক হাতে মম বাঁশের বাশরী এক হাতে রণ তূর্য’।

বরেণ্য চিত্রশিল্পী আমিনুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের অগণিত শহীদ নর-নারীর নির্মম নারকীয় হত্যাকা- নিয়ে ‘গণহত্যা’ শিরোনামে একটি বড় তৈলচিত্র নির্মাণ করেন। যাতে দেখা যাচ্ছে অগণিত নর-নারীর কঙ্কাল স্তূপকৃত হয়ে আছে। উপরের দিকে বাংলার সবুজ শ্যামল পটভূমি দেখে মনে হয় শহীদদের স্মরণে বাংলাদেশ বিলাপ করছে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে অবস্থানরত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের কিছু দুর্লভ চিত্রকর্ম আমরা পাই, যেমন-১৯৭১ এ দেশ পত্রিকায় শারদীয় সংখ্যায় প্রকাশিত কথাশিল্পী শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস ‘জাহান্নাম হতে বিদায়’-এর জন্য বেশকিছু স্কেচ, যা ছিল খুবই অসাধারণ। এই স্কেচগুলোতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা, নারী নির্যাতন, সাধারণ মানুষের ভীতি প্রকটভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অপেক্ষকৃত তরুণ শিল্পী রফিকুন নবী ঢাকায় অবরুদ্ধ ছিলেন। যুদ্ধের ৯ (নয়) মাস আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে বিজয়ের আকাক্সক্ষা করেছেন প্রতিটি মুহূর্তে। এ ভাবনা থেকেই আঁকেন ‘বিজয়’ নামের চিত্রটি। ১৯৭১ সালের আগস্টে এই চিত্রটির কাজ শুরু করেন আর শেষ করেন ১৬ই ডিসেম্বরে। এই ছবিটিতে বিজয়ের মাহাত্ম্য বোঝাতে প্রতীক হিসেবে হাতির ফিগার ব্যবহার করেন। চিত্রকলা যে প্রতিবাদের অনেক বড় হাতিয়ার হতে পারে এবং অবদান রাখতে পারে ‘বিজয়’-এ তারই প্রমাণ।

১৯৭১ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে একটি প্রদর্শনীতে ১৭ (সতের) জন শিল্পীর ৬৬ (ছেষট্টি)টি শিল্পকর্ম স্থান পায়। ঐতিহাসিক এই প্রদর্শনী দেখেই বিশ্ববাসী বাংলার দূরবস্থার কথা জানতে পেরেছিল। প্রদর্শনীতে অংশ গ্রহণকারী শিল্পীর নাম ও শিল্প:

গোলাম মোহাম্মদ- ‘সূর্য বিলোপ’,

অঞ্জন বণিক- ‘রক্তাক্ত বাংলাদেশ’

বীরেন সোম- ‘কান্না’, ‘দুঃস্বপ্ন’

চন্দ্রশেখর দে- ‘নিষ্পাপ শিকার’, ‘চঞ্চল পাখি’

মুস্তাফা মনোয়ার- ‘গর্বিত মা’, ‘নারী এবং পশু’

নাসির বিশ্বাস- ‘ধর্ষণ’ ইত্যাদি।

বর্বর পাকবাহিনীর ভারি অস্ত্র-সস্ত্র ও গোলাবারুদের বিপরীতে আমার বাংলা মায়ের মুক্তি পাগল দামাল সন্তানরা যেভাবে রণাঙ্গনে মোকাবেলা করেছিল তা অবিস্মরণীয় ও চিরস্মরণীয় দলিল হিসেবে থাকবে মহাকালের সাক্ষী হয়ে। বিভিন্ন আঙ্গিকে আমাদের শিল্পী যোদ্ধারা যে রণকৌশল প্রয়োগ করেছিলেন তারই কিয়দাংশ বর্ণনা করতে ক্ষুদ্র প্রয়াশ স্বল্প পরিসর এই লেখনির মাধ্যমে। সমাজে যে কোনো রুচি সংকটকালে রুচিহীনতা, অপসংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে সমাজকে বাঁচাতে এ দেশের শিল্পী সমাজ বরাবরের মতই এগিয়ে আসবে সুশীল স্বপ্ন বাস্তবায়নে- এটাই প্রত্যাশা।

সর্বশেষ

sakarya escort bayan bayan Eskişehir escort