
বুদ্ধদেব বসুর ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’ শিরোনামীয় কবিতা দিয়েই আলোচনা শুরু করা যাক- ‘আজ রাত্রে বালিশ ফেলে দাও, মাথা রাখো পর¯পরের বাহুতে,/ শোনো দূরে সমুদ্রের স্বর, আর ঝাউবনে স্বপ্নের মতো নিস্বন,/ ঘুমিয়ে পোড়ো না, কথা ব’লেও নষ্ট কোরো না এই রাত্রি-/ শুধু অনুভব করো অস্তিত্ব।’ মুক্তিযুদ্ধের কবিতা বাংলাদেশের কাব্যধারায় এক নতুনমাত্রা সৃষ্টি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে কবি ও কবিতা আপসহীন। আপামর জনগণ-সৈনিক, কৃষক-শ্রমিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, চাকরিজীবী সবাই মুক্তিযুদ্ধের অংশ। মুক্তিযুদ্ধের কবিতায় উপমা-উৎপ্রেক্ষা ও মিথ ব্যবহারও চমৎকার। মুক্তিযুদ্ধকালীন কবিতাগুলো আমরা ভাগ করতে পারি তিন ভাগে। মুক্তিযুদ্ধ, পূর্ববর্তী ও পরের। মুক্তিযুদ্ধের আগের কবিতাগুলো বীর বাঙালীর প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করেছে। বিশ্বের মুক্তিকামীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সহায়তা করেছে। বাঙালীর মনে অত্যাচারের বিরুদ্ধে জাগরিত করে একতাবদ্ধ করেছে। কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ এ দেশের প্রতিটি বাঙালীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য অধ্যায়। তবে (প্রকৃত অর্থে), মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বীরত্বগাথা বা মহাকাব্য রচিত হয়নি। কবিতায় ব্যক্তিগত উপলব্ধি ও জাতীয় জীবনের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হলেও তা পরিমাণে অনেক কম। তবে স্বাধীনতা-প্রসঙ্গের কবিতাগুলো শৌর্যে-বীর্যে কম নয়। শামসুর রাহমানের ‘বন্দী শিবির থেকে (১৯৭২ সালে প্রকাশিত)’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো তো যুদ্ধদিনের সময়লিপি, সময়ের কড়চা। দলিলও বটে। স্বাধীনতার পরে প্রকাশ হলেও এ গ্রন্থের অনেক কবিতা যুদ্ধের মধ্যে লেখা। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের আর এক সাহসী উচ্চাারণ। ‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই/আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি/ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে/এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়? (বাতাসে লাশের গন্ধ)’। কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, মহাদেব সাহা, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, শহীদ কাদরী, মুহাম্মদ নূরুল হুদা, দাউদ হায়দার, আবুল হাসান, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবিদ আজাদ, কামাল চৌধুরী, আবু হাসান শাহরিয়ার, হাসান হাফিজ, মাহবুব হাসান, নাসিমা সুলতানা, আসাদ মান্নান, নাসির আহমেদ, মাশুক চৌধুরী, ইকবাল আজিজ, জাহিদ হায়দার, সৈয়দ হায়দার, রবীন্দ্র গোপ, আবিদ আনোয়ার, মিনার মনসুর প্রমুখ কবির কবিতায় উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ। কোন কোন কবির মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতাও উঠে এসেছে। আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার রক্তজবার মতো উচ্চাারণ করেছেন অনেক কবি তাদের কবিতায়। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর বাংলা সাহিত্য নতুন বাঁক নেয়। কবিতাসাহিত্যে ভিন্নমাত্রা যোগ হয়। মহান ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন বা আগে-পরের বিভিন্ন পরিক্রমার পর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করেছি। এ ক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যের কবিতার ভূমিকা অনেক। বিশেষ করে সত্তর দশকের কবিতায় পাকিস্তান শাসনবিরোধী অবস্থান বেশি ফুটে উঠেছে। ১৯৭১ সালের প্রথম দিকে কবির লিখিত বেশ কিছু কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রাক-পরিবেশ ফুটে উঠেছে। প্রিয় মুক্তিযুদ্ধ মহান ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে পূর্ণতা পায়। ভাষা আন্দোলনের প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’- এমন সুদৃঢ় অঙ্গীকার আর ভাষাশহীদদের প্রতি ভালবাসা নিয়ে কবিতায় স্বদেশপ্রেমে নতুন করে যাত্রা শুরু। কবি শামসুর রাহমানও সে সময়ের পত্রিকার পাতায় কবিতায়, প্রবন্ধে, সাক্ষাতকারে, স¤পাদকীয়-উপস¤পাদকীয়তে, মিছিলে, মিটিংয়ে, গণআন্দোলনে, বক্ততায়, গণজোয়ারে প্রচ- সরব তার কবিতা নিয়ে শাসকের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে, প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে তিনি মানুষকে উজ্জীবিত করার জন্য কবিতা লিখছেন, সে সব কবিতা সে সময়ের মানুষকে অধিকার সচেতন ও রাজনীতিমুখী করে তুলেছিল আরও বেশি। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি গুলিস্তানে একটি মিছিলের সামনে একটি লাঠিতে শহীদ আসাদের রক্তাক্ত শার্ট দিয়ে বানানো পতাকা দেখে মানসিকভাবে মারাত্মক আলোড়িত হন শামসুর রাহমান এবং তিনি লেখেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি- ‘জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট/ উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।/ …গমগমে এভেন্যুর আনাচে কানাচে/ উড়ছে, উড়ছে অবিরাম/… আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা/সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখ- বস্ত্র মানবিক;/ আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা’। শহীদ কাদরী ভিন্নধারার কবি। তিনিও কবিতা লিখলেন- উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ে, অন্যায় আর অবিচারের প্রতি তার কবিতায় যোগ হলো দৃপ্ত উচ্চারণ। কবি রফিক আজাদ। মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার কোন বিকল্প নেই বলে উচ্চাারণ করেছেন। তার ‘একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মসমর্পণ’ কবিতায় বীরোচিত মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে। সিকান্দার আবু জাফরের অমর কবিতা- ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই/আমাদের সংগ্রাম চলবেই’। পরে ক্ষোভের মাত্রা বেড়ে গেল কবির। কবিতায় প্রকাশ করলেন শক্ত ভাষায়। উগরে দিলেন ক্ষোভ আর বঞ্চনা। আল্টিমেটাম দিলেন। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তার ‘বাংলা ছাড়ো’ কবিতায় উচ্চারণ করলেন এভাবে- ‘তুমি আমার জলস্থলের/মাদুর থেকে নামো/তুমি বাংলা ছাড়ো।’ কবি হেলাল হাফিজ উদাত্ত আহ্বান করলেন তরুণদেরকে- যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। কারণ, আমাদের মতো কবিও জানতেন তরুণ সমাজকে ঘা মেরে জাগাতে হবে। স্বাধীনতার জন্য এর কোন বিকল্প নেই। তরুণরাই কিন্তু আমাদের বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন- ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় (সংক্ষেপিত)’। হাসান হাফিজুর রহমানের স্মৃতি, তোমার আপন পতাকা, এখন সকল শব্দই, আবু জাফর ওবায়দুল্লার আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি, আহমদ রফিকের এ দেশ আমার স্বর্গ, আবু হেনা মোস্তফা কামালের ছবি, ফজল শাহবুদ্দিনের এপ্রিলের একটি দিন ১৯৭১, বাংলাদেশ একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাকে, শহীদ কাদরীর নিষিদ্ধ জার্নাল থেকে, ব্ল্যাকআউটের পূর্ণিমায় বেলাল চৌধুরীর স্বদেশভূমি, মর্মে মর্মে স্বাধীনতা ইত্যাদি কবিতাসাহিত্যে স্বাধীনতা আর অনিয়মের কথা, বাঙালীর ব্যথা-বেদনার কথা উচ্চাারণ করেছেন কবিরা। অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ অনেক টেনে এনেছেন। দৃপ্ত উচ্চাারণ করেছেন পাকিস্তানী অনিয়ম ও অবিচারের বিপক্ষে। কবিতা আর ছড়াসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আল মাহমুদের ‘ক্যামোফ্লাজ’ কবিতাটি এখানে স্মরণযোগ্য। শক্তিমাণ সাহিত্যিক ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নাটক-প্রবন্ধের পাশাপাশি রণাঙ্গনের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কবিতা রচনা করেছেন। ‘বেজান শহরের জন্য কোরাস’, ‘গেরিলা’ শিরোনামসহ সে সময়ের বেশ কিছু কবিতায় স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান ও বিভিন্ন অনুষঙ্গ কবিতায় উচ্চাারণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশীদের জন্য বড় অহংকারের জায়গা। আপামর জনসাধারণের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবীর পাশাপাশি কবিরাও এগিয়ে থাকবে। কবিদের অবদানও অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাংলা কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের অনেক কবিতা সময়ের দলিল হিসেবেই থেকে যাবে। স্বাধীনতার আগে-পরে আমরা অনেক সময় পেয়েছি। এখানে কিছু কবিতা প্রতিনিধি হিসেবে আলোচনায় এসেছে। অনেক কবিতার কথা তুলে ধরা যায়নি। তারপরও বলা যায়, স্বাধীনতাপ্রসঙ্গ কবিতা তুলনামূলক অনেক কম পেয়েছি; এখনও কম পাচ্ছি। তবে স্বাধীনতা নিয়ে লিখিত অনেক কবিতা শৌর্যবান। স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে মহাকাব্য রচনা হয়নি। আধুনিক যুগে এটি কম গুরুত্ব পেলেও এ শাখায় স্বাধীনতা ও বীরদের বীরত্বগাথা নিয়ে কিছু মহাকাব্য হতে পারতাম। নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা, উলঙ্গ কিশোর’ কবিতার অংশ দিয়েই শেষ করা যাক। ‘জননীর নাভিমূল ছিন্ন করা রক্তজ কিশোর তুমি/ স্বাধীনতা, তুমি দীর্ঘজীবী হও। তুমি বেঁচে থাকো/ আমার অস্তিত্বে, স্বপ্নে, প্রেমে, বল পেন্সিলের/যথেচ্ছ অক্ষরে/শব্দে/যৌবনে/ কবিতায়।’


