
আজিজুল কদির,শান্তিনিকেতন ঘুরে এসে
যত দিন গিয়েছে শান্তিনিকেতনের বল্লভপুরের ‘আমার কুটির’-এর জৌলুস বেড়েছে। ধীরে ধীরে দেশ-বিদেশ থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতন দেখতে আসা পর্যটকদের কাছেও অবশ্য ইতিহাস-সমৃদ্ধ দর্শনীয় স্থান হিসেবে রূপান্তিরত হয়েছে ‘আমার কুটির’। এখানকার চামড়ার শিল্পের পাশাপাশি বাটিক-বুটিকের সমাহারে পূর্ণ ‘আমার কুটির’-এর গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে উঠেছে তার ইতিহাস-সমৃদ্ধ সংগ্রহশালাও। যেখানে মূলত স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে কিছু পুরনো আলোকচিত্র রয়েছে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় থেকে সুভাষচন্দ্রবসু তাঁদের ‘আমার কুটির’ পরিদর্শনের সচিত্র বর্ণনা ওই সংগ্রহশালায় দেখা যায়।
শান্তিনিকেতন থেকে মাত্র চার কিলোমিটার ভিতরে অবস্থিত আমার কুটির। একে হস্তশিল্পের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হলেও ‘আমার কুটির’ মূলত একটি আন্দোলন। ভারতের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আমার কুটিরের ভূমিকা ছিল ব্যাপক। মূলত ‘আমার কুটির’ সোসাইটি ফর রুরাল ডেভেলাপমেন্ট প্রজেক্ট। জানা যায়,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত শ্রীনিকেতনের গ্রামোন্নয়নের কর্মপদ্ধতির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রয়াত স্বাধীনতা সংগ্রামী সুষেণ মুখার্জ্জি ১৯২৩ খ্রীষ্টাব্দে গড়ে তোলেন এই ‘আমার কুটির’। ১৯৩২ খ্রীষ্টাব্দে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আশ্রয়দানের অপরাধে আমার কুটিরের কাজকর্ম ব্রিটিশ পুলিশের নজরে আসে এবং এই কাজের জন্য ১৯৩৭ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত সুষেণ মুখার্জ্জিকে কারাগার বরণ করতে হয়। পরিণতিতে কিছুদিনের জন্য আমার কুটিরের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। কারাগারে কাটানোর সময় সুষেণ মুখার্জ্জির সঙ্গে পরিচয় হয় পান্নালাল দাসগুপ্ত, মণি গাঙ্গুলী প্রমুখ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। ১৯৩৮ খ্রীষ্টাব্দে তদানিন্তন ইংরেজ সরকার নানা কারাগার থেকে বিপ্লবীদের মুক্তি দিতে শুরু করে। সুষেণ মুখার্জ্জির আহ্বানে বাংলার বিপ্লবীদের একাংশ আমার কুটিরে এসে বসবাস শুরু করেন এবং গড়ে তোলেন কমিউনিস্ট পার্টি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে অনেক বিপ্লবী আমার কুটির ত্যাগ করেন এবং গ্রামে গিয়ে কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ভারত ছাড়ো আন্দোলনে (১৯৪২) কুটিরবাসী প্রাক্তন বিপ্লবীরা অনেকেই প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
‘আমার কুটির’ সোসাইটি ফর রুরাল ডেভলপমেন্ট’-এর সভাপতি আনন্দময় সেন জানান, স্বাধীনতা লাভের আগে আমার কুটির-এর নেতৃত্বে আশপাশ এলাকার বেশ কয়েকটি গ্রামে নৈশ স্কুল, লাঠি চালানো ও তীর-ধনুক চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তাঁর কথায়, “রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আধুনিক বিদ্যালয় থেকে আদর্শ মানুষ বেরোয় না’। তাঁর সেই কথা স্মরণ রেখেই আমার কুটির সাধারণ মানুষদের নিয়ে নানা কাজ করে চলেছে।” এরই মধ্যে আমার কুটিরে অবস্থানরত দেশপ্রেমিকদের সমাজ গঠন ও জাতি গঠনের এই প্রচেষ্টার কথা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কুটিরের কাজকর্ম দেখতে এসেছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু (১৯৩৯), দেশব্রতী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধায় ও নানা স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। এই পর্যন্ত আমার কুটিরের কাজকর্ম পরিদর্শনে এসেছেন বহু মন্ত্রী, বিভিন্ন প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী, বিচারক, বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষজন।
আমার কুটিরের ম্যানেজার তুফান সিং জানান, ভারতের স্বাধীনোত্তরকালে আমার কুটির গ্রামোন্নয়ন সংগঠনে পরিণত হয় এবং মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে গ্রামীণ কুটির শিল্পের উন্নতি ও আত্মনির্ভরশীল মানুষ তৈরির মধ্য দিয়ে উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখা। প্রাক্তন বিপ্লবী ও সমাজসেবী পান্নালাল দাশগুপ্তের প্রচেষ্টায় ১৯৭৮ খ্রীষ্টাব্দে ‘আমার কুটির সোসাইটি ফর রুরাল ডেভেলাপমেন্ট’ শিরোনামে নথিভুক্ত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় পরিণত হয়। তখন থেকে অদ্যাবধি আমার কুটির গ্রামীণ হস্তশিল্প বিকাশে প্রশিক্ষণ, উৎপাদন ও বিক্রয়ে সহায়তা দান করে আসছে। বর্তমানে আমার কুটির সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ এবং হাজারো হস্তশিল্পীকে বিভিন্ন প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ দানের সঙ্গে যুক্ত, বিশেষত মহিলাগোষ্ঠী ও উদ্যোগীদের নানাভাবে সহায়তা দান করে থাকে।
দেখা হলো, আমার কুটিরে ঘুরতে আসা চট্টগ্রাম চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন ছাত্র ভাস্কর ফজলে রাব্বী ,আবেদুল ইসলাম ও মিখাইল রফিকের সাথে। তাঁরা এই কুটির শিল্পাঙ্গন ঘুরে দেখে কেনাকাটা করেছেন বাটিক করা ফতুয়া,ব্যাগসহ বেশ কিছু পাটের সামগ্রী। আর তাদের মতে, বেশ নান্দনিক শিল্পসামগ্রীর সমাহার রয়েছে এখানে। যা দামেও সাশ্রয়ী। এর মধ্যে ডোকরা কাজগুলো বেশ আকর্ষণীয়। আর ইতিহাস-সমৃদ্ধ সংগ্রহশালায় পর্যকটকদের আনাগোনায় মনে হলো জৌলুস আছে।


