১২ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রচ্ছদজানা-অজানাঅদ্ভুত দ্যোতনার সৃষ্টি আন্ধারমানিক

অদ্ভুত দ্যোতনার সৃষ্টি আন্ধারমানিক

‘নারিশ্যা” কোনো ব্যক্তি নয়,পাহাড়ি ঝিরি। দু’পাহাড়ের সরু খাদে গাছের অবিচ্ছেদ্য আবরণে, সূর্যকিরণ প্রবেশ না করায়,আলোছায়ার বদৌলতে আর অন্ধকারে মানিকোজ্জ্বল সূর্যকিরণে ঝিরির সম্মুখে এক অদ্ভুত দ্যোতনার সৃষ্টি হয়, ঝিরির গভীরতম অংশের নাম আন্ধারমানিক। বান্দরবানের থানচি উপজেলায় রিজার্ভ ফরেস্ট আর সাংগু নদীর রূপ এখানে ঐশ্বর্যশালী। কয়েক কিঃমিঃ লম্বা ঝিরিপথটি দেশের অন্যতম সেরা বিচিত্র, যা অবলোকনের পরতে পরতে রয়েছে গা ছমছম করা রোমাঞ্চ।

১১ সদস্যসমেত জিডিএম ট্যুর গ্রুপের সদস্য হয়ে ঢাকা থেকে স্লিপিং কোচে চড়ে বুদ্ধপূর্ণিমার জোৎস্নাসিক্ত রাতকে পুঁজি করে গত ৩ মে রাতে বান্দরবানের আলীকদমের পথ ধরি। ভোরের আলো ফুটতেই চকোরিয়ার ফাইস্যাখালিতে নেমে ইয়াংছা ও কানা মেম্বার ঘাট চেকপোস্টে বিজিবি’র আনুষ্ঠানিকতা সেরে আমাদের জিপ এগিয়ে চলে। আলীকদমে পৌঁছেই প্রাতঃক্রিয়াদি আর প্রাতঃরাশ সেরে জীপযোগে কুড়োকপাতা বাজারে যাই। শুরু হয় ম্যারাথন হাঁটাপর্ব। টানা ৬ঘন্টা ক্লান্তিহীন পাহাড়ি পথ বেয়ে ঘন অরণ্যেঘেরা বুলিয়াপাড়ার সুলতানের বাড়িতে কলা ও চিড়ে পানির আস্বাদন নেই। সুদক্ষ ট্যুর গাইডত্রয়ের (মামুন,পলাশ,জাহিদ) তাৎক্ষণিক পরামর্শে বিকেল ৫টায় আবার হাঁটাপথ ধরি, গন্তব্য গহীন অরণ্যের মাইকোয়া পাড়া।

পাহাড়ী রাস্তায় বিকেল থেকে রাত গড়িয়ে পড়ে। বনের গহীন থেকে আরও গহীনে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে বিশালকায় পাথরঝিরি পেরিয়ে শনশন, মর্মর শব্দে এগিয়ে চলি, আগে থেকেই ব্যাগ ছোট থাকার প্ল্যান সত্ত্বেও শুকনো খাবারসহ স্বল্প পোষাকের ঝুলানো ব্যাগ বেশ অস্বস্তিকর লাগছিলো।পানি স্বল্পতায় পাহাড়ি ঝিরিই ছিল একমাত্র অবলম্বন ।

হাঁটাপথে রাত ৯টায় দিকভ্রান্ত হয়ে অপ্রস্তুত বিরসবদনে সবাই বসে পড়ি। চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ও অনিশ্চিত গন্তব্যে সকলের মাঝে কিছুটা উৎকন্ঠার ভাব। ট্যুর গাইডের ৩সদস্য ৪০মি. প্রাণান্তকর চেষ্টায়ও সঠিক রাস্তা না পেয়ে পুনরায় একই পথে ঘন্টাখানিক হেঁটে রাত ১১টায় অরণ্যে ঢাকা মেহ্লা বাবুর জুমঘরে রাত্রিযাপনের সিদ্ধান্ত নিই। ঢাকা থেকে নিয়ে আসা ডালচালে খিচুড়ি রান্না চলে। বলে রাখা প্রয়োজন, দুষ্প্রাপ্য পাহাড়ে খাবারের জন্য ২টি মুরগি গাইডরা সাথী করে নিয়ে আসলেও পথিমধ্যে ১টি ফুড়ুৎ করে উড়ে যায়, সঙ্গিবিহীন একাকিনী মুরগীটি সারাদিন ক্লান্তিহীন পথ ভ্রমণ করে, যা আমাদের অনেককেই অস্বস্তিতে ফেলেছিল। পরিশেষে সম্মিলিত মতামতে আনীত মুরগটি আশ্রয়দাতা মেহ্লা বাবুকে (মুরং) দেয়ার সিদ্ধান্ত নিই । সমস্যা হলো, সহজ-সরল মেহ্লাকে যতোই বাংলা/চাঁটগা ভাষায় বলা হচ্ছে,তিনি মুরং ভাষা ছাড়া কিছুই বুঝেন না। বলা হচ্ছে মুরগীটি উপহার, তবু তিনি বারংবার আন্তরিকভাবে খাঁচাসহ মুরগী ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন।

জঙ্গল থেকে কেটে আনা কলাপাতায় পরিবেশিত আহার সেড়ে রাত ১২.৩০টায় উন্মুক্ত আকাশের নীচে পাহাড়ি জুমঘরে সবাই ঘুমিয়ে পড়ি। পরিশ্রান্ত শরীরে খিচুড়ি ও ঘুম চিত্তাকর্ষক ছিলো। ভোর ৫টায় ট্যুর গাইডম্যান পলাশ ভাইয়ের অস্বস্তিকর ডাকে ঘুম ভাঙ্গে। উন্মুক্ত পরিবেশে প্রাতঃক্রিয়ায় পরমশান্তির পরশ পাই, পরবর্তীতে রেডিমেড নুডলস খেয়ে সকাল ৬টায় সবাই বেরিয়ে পড়ি। এবারে আর ভুল নয়,পাহাড়ি গাইড লিম্বুয়াইকে সাথী করে পাথুরে ঝিরিও দৈত্যাকার পাহাড় পাড়ি দেই। হাঁটাপথে সহকর্মী ও সহযাত্রী সিদ্দিকী ও রফিকের রসালো চুটকীতে আমরা হালকা বিনোদনের খোরাক পাই।

সকাল ১০টায় মাইকোয়া পাড়ায় পৌঁছে হালকা নাস্তা করে কাঙ্ক্ষিত আন্ধারমানিকের পথ ধরি। অসহনীয় গরম আর উঁচুনীচু সর্পিলাকার পথে শুকনো খাবারে পেট চো চো করছিলো। দৈত্যাকার পাহাড়গুলো হামাগুঁড়ি দিয়ে চলতে খুবই কষ্টকর হচ্ছিল। পাহাড়ি পথের পরবর্তী বিশালকার পাথুরে পথ আর শেষ হয়না, কোথাও পানি নেই, ঝিরি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। গহীন অরণ্যে সূর্য মাঝে মধ্যে তার সরব উপস্থিতি জানান দিচ্ছিলো। অবশেষে প্রাণান্তকর হাঁটা লড়াইয়ের পর বিকেল ৪টায় আন্ধারমানিক ও নারিশ্যা পাড়ায় আসি।

এবারে পাহাড়ী গাইড প্রণোম ও জিহাদের পরামর্শে চুপিসারে বিজিবির চেকপোস্টকে এড়িয়ে বহুল কাঙ্ক্ষিত গুহায় পৌঁছি। মন জানান দিলো আমরা পেরেছি, হ্যাঁ হ্যাঁ সত্যিই পেরেছি, ১৭ঘন্টার দুরতিক্রম্য পাথুরে-পাহাড়ি পথের হাঁটার ফসল আন্ধারমানিক, এ এক অনন্য অনুভূতি। পানিপথ পেরিয়ে পাথর,গুহা আর প্রকৃতির সাথে চলে আমাদের ছবি তোলার মহোৎসব। উৎফুল্ল চিত্তে নীলাভ প্রকৃতি সজীব প্রাণ বিলিয়ে দেয়ার সাথে হলুদাভ সূর্যের ম্রিয়মাণ হাসির উপরে রংতুলির আঁচর কেটে দিচ্ছিলো।

এবারে ফিরতি পথের পালা। বুদ্ধপূর্ণিমার পূর্ণ রাতের চাঁদে গহীন অরণ্য, অপরূপ প্রকৃতি নতুন সাজে সেজেছে, দুর্বিষহ রাস্তায় আর পথ মাড়ানো যাচ্ছিলো না। খানিকটা বিশ্রাম, খানিকটা হাঁটা এভাবেই চলে ভরা পূর্ণিমায় বুনোচাঁদকে সঙ্গী করে পথচলা, রাত ১০.৩০টায় মাইকোয়া পাড়ায় পোঁছে একবুক কুয়ো পানিতে পরম শান্তির স্নানাদি সেরে খাবার খেয়ে কারবারির বাড়িতে বাঁশের মাচায় শরীর এলিয়ে দেই।

পরিশ্রান্ত শরীরে দুমিনিটেই রাজ্যের ঘুম এসে পড়ে। পরদিন সকাল ৭টায় আবার হাঁটা পথ ধরি। পূর্বের হারানো সেই জুমঘর ও বুলিয়াপাড়ায় খনিক বিশ্রাম ও পাহাড়ি ঝিরিতে আনন্দিত চিত্তে গোসল সেড়ে বিকেল ৫টায় মাতামুহুরি নদীর তীরে পৌঁছি। হাঁটুপানির মাতামুহুরির অপরপাড়ে কুরোকপাতা বাজারে আমাদের জীপ আগে থেকেই অপেক্ষামান ছিলো। অবশেষে হৃর্ষিত মনে গাড়িতে আরোহন করে রাতের খাবারের জন্য আলী কদমের দামতুয়া রেষ্টুরেন্টে আসি। রাত ১২টায় আমাদের গাড়ি ঢাকার পথে রওনা দেয়। ক্লান্তি ভর করায় রাজ্যের ঘুম আসে, ঘুমের ভোরে ব্যস্ত ঢাকার পেঁ পোঁ শব্দে কান ভারী হয়ে উঠে, চোখ বন্ধ করে অনুভব করছি আন্ধারমানিকের গিরি-ঝিরি পথ। স্বল্প সময়ের এই ভ্রমণ মনে গেঁথে থাকবে অনেকদিন।

সর্বশেষ