১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রচ্ছদবিশেষ ফিচারসড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দায় কে নেবে...?

সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দায় কে নেবে…?

সারাদেশে যে হারে সড়ক দুর্ঘটনা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। সড়কের বেশিরভাগ দুর্ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড বলেই মনে করে সাধারণ মানুষ। নিশ্চয় এর যৌক্তিক কারণও আছে। সড়ক দুর্ঘটনা নির্বিচারে ড়ে নিচ্ছে দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিতে অবদান রাখা নানা পেশার মানুষ সহ সকল শ্রেণির মানুষের প্রাণ।

এ প্রসঙ্গে আমি নিজের জেলার একটি মহাসড়কের চিত্র তুলে ধরতে চাই। চট্টগ্রাম নগরীর অক্সিজেন থেকে হাটহাজারী, নাজিরহাট, রাউজান, ফটিকছড়ি, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি মহাসড়কে বাস, সিএনজি অটোরিকশা, ট্রাক, জীপসহ বিভিন্ন রকম গাড়ি বেপরোয়া গতিতে চলাচল করাতে প্রতিনিয়ত হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা। সম্প্রতি চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে বাস সিএনজি অটোরিকশার সংঘর্ষে সাত জন নিহত হয়েছে। সাতজনই একই পরিবারের সদস্য। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন নারী, একজন পুরুষ ও তিনটি শিশু রয়েছে। নিহতরা একটি শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চন্দনাইশ উপজেলা জোয়ার এলাকা থেকে হাটহাজারীর হয়ে ফটিকছড়ি আত্মীয়ের বাড়ি যাচ্ছিলেন।

এই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চালকদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই সড়কে চালকদের ঠিকভাবে গাড়ি চালানোর চেয়ে নজর বেশি থাকে যাত্রী ওঠা নামার দিকে। বিভিন্ন স্থান থেকে এত যাত্রী ওঠানো হয় যে বাস বা সিএনজিতে যা অনেক গাদাগাদি করে যেতে হয়। যাত্রীরা চালককে নিষেধ করলেও সেইটা তারা শোনে না। বেপরোয়া চালকদের দ্বারা সংগঠিত অসংখ্য দুর্ঘটনার একটি। এরকম দুর্ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। পরিতাপের বিষয় যে যাত্রীদের জন্য গণপরিবহণের অস্তিত্ব, বেপরোয়া চালকদের কারণে সেই যাত্রীদেরই একের পর এক প্রাণ যাচ্ছে। একে হত্যা ছাড়া কী বলা যেতে পারে।

বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, যেসব চালকের ভুলের জন্য দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। তাদের অধিকাংশই কিভাবে যেন দুর্ঘটনা থেকে প্রাণে বেঁচে যায়। জনসাধারণের ধারণা, চালকরা যেন গাড়ি চালানোর দক্ষতা অর্জনের চেয়ে দুর্ঘটনায় পড়লে কি ভাবে পালিয়ে যাওয়া যায়, এ প্রশিক্ষণই বেশি নিয়ে থাকে।

সড়ক দুর্ঘটনায় কোন শ্রেণী ভেদ থাকে না। ধনী দরিদ্র, রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট ব্যক্তি এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও রেহাই পায় না। বলা যায়, বেপরোয়া ও দুর্বিনীত গাড়ি চালনা সকলের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যেসব দুর্ঘটনা ঘটে এবং যেসব মানুষ মৃত্যুবরণ করে তার শতকরা ৭০ ভাগই কর্মক্ষম এবং দেশের অর্থনীতিতে তাদের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যখন দুর্ঘটনায় মারা যায়, তখন সে পরিবারটি ধ্বংস হয়ে যায়।

যারা আহত হয়, তারা পরিবার ও সমাজের বোঝায় পরিণত হয়। চিকিৎসা করতে গিয়ে পুরো পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। তাদের ভারণপোষণ ও মানুষ করার দায়িত্ব কাউকে নিতে দেখা যায় না। এমন শত শত পরিবার রয়েছে, যারা সড়ক দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে এক অনিশ্চিত জীবনের পতিত হয়েছে। চালক বেঁচে গেলে হয়ত তার পরিবার অনিশ্চয়তার হাত থেকে রক্ষা পায়। কিন্তু তার কারণে যার বা যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের পরিবারগুলোর কি হয়েছে তা কি কখনো ভেবে দেখে? সে যে পরিবহণ প্রতিষ্ঠানের গাড়িটি চালিয়েছে সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকরা কি এ বিষয়টি কখনো ভেবেছে? সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কি কখনো তাদের খোঁজ খবর নেয়?- নেয় না। বরং দেখেছি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা পরিবহন মালিকরা দুর্ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করতেছে।

চালককে ঘাতক বলা যাবে না বলে তীব্র আপত্তি করেছে। এর কারণে গণপরিবহনের সাথে সংশ্লিষ্ট চালক এবং মালিকদের এক ধরনের দায়মুক্তি রয়েছে। তারা অদক্ষ ও অযোগ্য হলেও তাদের কারণে দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু হলে তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে তারা যেভাবে খুশি সেভাবে গাড়ি চালাবে এতে দুর্ঘটনা ঘটলে তাদের দায়ী করা যাবে না। দায়মুক্তির এই প্রবণতা থেকে যতদিন না বের হয়ে আসা যাবে। ততদিন মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক যে শব্দেই প্রকাশ করা হোক না কেন, দুর্ঘটনা যে ঘটবে তাতে সন্দেহ নেই।

বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি বছর সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। বিশ্বব্যাংক বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে এ সংখ্যা আরও বেশি। এসব দুর্ঘটনার বেশিরভাগই ঘটেছে চালকের ভুল এবং বেপরোয়া মনোভাবের কারণে। এটাই হওয়া স্বাভাবিক। যে দেশে অসংখ্য চালক ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালায় সেখানে দুর্ঘটনার হার ও মানুষের হতাহতের ঘটনা এবং পরিবার পরিজনের হাহাকার ও আর্তনাদ কমার কোন কারণ নেই। বিশ্বের কোন সভ্য দেশে মানুষ মারার এমন চলমান গণপরিবহণ ব্যবস্থা আছে কিনা, আমার জানা নেই। আমাদের দেশে এসব নিয়ম কানুন দূরে থাক, যে সংস্থা ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয় তাদের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন অভিযোগ অভিযোগ রয়েছে। তবে এখন অনেকটা পরিবর্তন দিকে যাচ্ছে। তার উপর রয়েছে গাড়ি চালক, শ্রমিক সংগঠন এবং পরিবহন মালিকদের বেপরোয়া মনোভাব।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে বহু কথা হয়েছে। পত্রিকায় এ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অনেক লেখালেখি করেছে। এখনও করছে। বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। এসবে যে কোন কাজ হচ্ছে না, তা সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির হার প্রমাণ করে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের কোন বিচলন আছে বলেও মনে হচ্ছে না।

তবে তাদের বেপরোয়া মনোভাব রোখার সাধ্য কারও নেই। এর ফলে বেপরোয়া চালকরা নিজেদের ‘রাস্তার রাজা’ ভাববে, যাত্রীরা তাদের কাছে জিম্মি হবে, সড়ক-মহাসড়ক মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হবে এটাই স্বাভাবিক। এ ধরনের প্রবণতা মানবঘাতি এবং জনসাধারণের স্বাভাবিক চলাচলে মানবাধিকার খর্ব করা ছাড়া কিছুই নয়।

সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে মাঝে মাঝে বিআরটিএ, হাইওয়ে পুলিশ এবং ট্রাফিক পুলিশ মোবাইল কোর্ট বসে ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না কেন? এভাবে আর কতদিন দেশের কর্মক্ষম ব্যক্তিদের বাঁচাতে এর স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজনীয়তা কি সরকার অনুভব করছে না? তাদের জীবন কি গণপরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা ও কিছু বেপরোয়া গাড়ি চালকের হাতে জিম্মি হয়ে থাকবে।

ফিটনেসবিহীন গাড়ি ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থাপনাসহ যত ধরনের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা রয়েছে, তা বছরের পর বছর চলছে অথচ কোনো প্রতিকার নেই । সড়ক মহাসড়কে আর কত প্রাণ ঝরলে পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টদের হুঁশ হবে তা কেউ বলতে পারে না। আর কবে এ খাতটিকে আধুনিক ও সুশৃঙ্খল করে গড়ে তুলতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে সরকার?

সুমন গোস্বামী
গণমাধ্যমকর্মী

সর্বশেষ