২২শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রচ্ছদবিশেষ ফিচারগণমাধ্যম সংস্কৃতি ও সংস্কার

গণমাধ্যম সংস্কৃতি ও সংস্কার

রফিকুল আনোয়ার রাসেল

“মনে রাখা প্রয়োজন – অশিক্ষিত মানুষের মূর্খতা ও ধূর্ততা সমাজের যে ক্ষতি করে, তারচে বেশি ক্ষতি করে শিক্ষিত মানুষের অসততা ও উদ্দেশ্যমূলক ষড়যন্ত্র। “

যেকোনো গণঅভ্যুত্থান ও বিপ্লব সংগঠনের পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যম তথা টিভি, সিনেমা, পত্রিকা, নাটক, সংবাদপত্র, সামাজিক ও অনলাইন মাধ্যমকে খুব গুরুত্ব দিয়ে পুনর্গঠন, সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। যেমন রুশ বিপ্লব, কিউবার বিপ্লব, ইরানের বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে বিপ্লবীরা টিভি সিনেমাকে নতুন আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন। এদের প্রধান কাজ ছিল, যেমন নিজেদের আদর্শ প্রচার করা, তেমনি প্রতিবিপ্লবী ও অতি বিপ্লবীদের মিথ্যাচার, অত্যাচার বা অতি কর্মকাণ্ডকে মোকাবিলা ও প্রতিহত করা। ভালো খারাপ এমন বিষয় পরে, আগে স্ট্রাটেজিক ভাবে ব্যাবস্থাটি নিতে হয়।

আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ নেতা ম্যালকম এক্স বলেছিলেন,

The media’s the most powerful entity on earth. They have the power to make the innocent guilty and to make the guilty innocent, and that’s power. Because they control the minds of the masses.

আমরা দেখি, ২০০৯-২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশের শিল্প, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের ৮০-৮৫% গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিবর্গ শেখ হাসিনা নেতৃত্বনাধীন সরকারের নানা পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন। তারা নিজেদের সুযোগ ও সুবিধার ভাবনায় পেশাদারী দায়িত্ব ভুলে, একটা নির্দিষ্ট দলের প্রোপাগাণ্ডা মিশনে সম্পৃক্ত ছিলেন। ফলে, তাদের অবস্থান পক্ষপাত দুষ্ট হবেই। ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পরে, এই সেক্টরের দিকে গণ অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সমাজও খুব দক্ষতার সাথে পুনর্গঠন ও সংস্কার করারর দিকে মনোযোগ দেননি। কেউ কেউ পরিশ্রমের সাথে নানাভাবে শিল্প ও সিনেমার ক্ষেত্রগুলোতে কাজ করার চেষ্টা করলেও, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক মাধ্যমে খুব বেশি কাউকে একটিভ থাকতে দেখা যায় নাই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, উদ্দেশ্য, অর্থলাভ ও সুযোগ প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে কিছু জুলাই আগস্ট নিয়ে গল্প, রচনা, বই, শর্টফিল্ম, তথ্যচিত্র নির্মাণ করে অর্থব্যয় হলেও, নান্দনিক ও সৃজনশীল কোন কাজ সেভাবে প্রকাশ পায়নি। এমনকি এতো এতো চ্যানেল যারা ভেতরে ভেতরে আওয়ামী মালিকানা থেকে বিএনপি জামাত মালিকানায় স্থানান্তর হয়েছে তারাও একটি নাটক বা উল্লেখযোগ্য কাজ দেখাতে পারবে না। ( শুনেছি কেউ নির্মাণ করলেও তা গুরুত্ব দেয়া হয় না৷) এখন হয়তো অনেকে কাজ করছে, কিন্তু ১০ মাসেও এমন ভাবে জুলাই আগস্টের ঘটে যাওয়া কর্মকাণ্ড উপেক্ষা করা হয়েছে, যা সামাজিক সাংস্কৃতিক ভাবে খুবই দু:খজনক। এমন একটা সময়ে আমরা আছি- যেখানে সরকারি সহযোগিতা না পেলে, কেউ যেমন একটি ছোট মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নিয়ে আগ্রহী নয়, তেমনি টাকা না পেলে কেউ জুলাই আগস্ট শহীদদেরও মনে রাখার মতো কাজ করবে না। এমনকি গত সময়ের আওয়ামী লীগের এতো লোক শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে এতো শত হাজার কাজ করেছেন, তাও টাকা আত্মসাৎ এর জন্যই। গত নভেম্বরে দৃশ্য মাধ্যম শিল্পীদের একটি আলাপে বলেছিলাম – টাকা পেলে মুজিব বায়োপিক, বা আবু সাইদ বায়োপিক যারা নির্মাণের কথা বলেন, তারা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক লাভের কথাই বলেন, সেটা ব্যাক্তি হোক বা এজেন্সি। তাদের কাছে আনন্দযাত্রা যা, মঙ্গলযাত্রাও তা। কাজ পেলেই হলো।

খুব খেয়াল করলে দেখা যাবে, যে জাতি, প্যালেস্টাইনের জন্য সংহতি জানাতে এসে বাটা বা কেএফসি ভাংচুর ও লুট করে, তাদের দ্বারা অন্তত প্যালেস্টাইনী কেন, পৃথিবীর কোন গোষ্ঠী স্বাধীনতা বা মুক্তির স্বপ্ন দেখতে পারে না। তারা লুটপাটের স্বপ্নই দেখে। যা আমাদের ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনৈতিক চর্চার বাস্তবতা। মনে হচ্ছে, পূর্ব পাকিস্তানের নেতা, কর্মী, ব্যবসায়ী, আমলারা পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে ক্ষমতা ও লুটপাটে সুবিধা করতে পারছিল না বলে, দেশ স্বাধীন করে নিজের দেশ নিজেরাই লুটে খাবার ভাবনায় ছিল। এমন সব ধারণা নিয়ে দেশ চালায় –
আমার বাপের দেশ, আমার দেশ, আমাদের পরিবারের দেশ, আমাদের দলের দেশ, আমরাই এদেশের পিতা মাতা কন্যা নাতিপুতি, আমরাই এদেশের অতীত বর্তমান ভবিষ্যতের মালিক, আমরাই রাজত্ব করবো, আমাদের চৌদ্দগুষ্টিই খালি লুটপাট করব। কিছু কিছু মোসাহেব, তাবেদার, ফকির মিস্কিনকে ভাগ দেব। বাবুর্চি, ড্রাইভার,পিয়ন দের ৩০০-৪০০ কোটি টাকা বানানোর সুযোগ দিব। আর বাকি সব আমাদের। এই কারনে মুক্তিযুদ্ধ হ’য়েছে আমাদের অবদান- আর মাঝখানে লক্ষ লক্ষ শহীদ আর নির্যাতিত নারী ‘রা হলেন কোলাটোরাল ড্যামেজ, মানে বেঘোরে মৃত্যু। হায় সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ?

আজকে দেশের খ্যাতনামা অনেক সংবাদপত্র সমূহের মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের জারীকৃত একটি গেজেট প্রকাশের সংবাদ প্রকাশ দেখে আমি সত্যি বিস্মিত। ২০২৪ সালের আগস্ট সেপ্টেম্বর মাসেই ভারত ও অনেক দেশের প্রপাগাণ্ডা নিউজ ও বিভ্রান্তিকর নিউজ আক্রমণ দেখে বলেছিলাম – একটি শক্তিশালী ‘মিডিয়া ব্রিগেড’ করা উচিত আমাদের নতুন সরকারের। দক্ষ আদর্শিক মিডিয়া কর্মীদের নিয়ে। অথচ, একটি মিডিয়া সংস্কার কমিটি (সেখানেও দেখা গেল বিগত সরকারের বিতর্কিত লোকজন ভরা) করে দিয়ে, তাদের পড়াশোনা করতে দিয়ে সরকার চুপ মেরে গেল। তারা পড়াশোনা করে, গবেষণা করে রিপোর্ট দিলেন। তারা পাশ করেছেন, কিন্তু ততদিনে পুরনো লোকজন যারা ঘাপটি মেরে ছিল, তারা সুযোগ পেয়ে এই শিক্ষার্থীদের নানা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারে লেগে গেল। কেউ কেউ দেখা গেল, আজ এর পেছনে লাগে ত, কাল ওর পেছনে। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে নানা লোকজন যা ইচ্ছে মনগড়া কেচ্ছা কাহিনী বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছাড়ে, আর তা গিলতে থাকে সোশাল মিডিয়া একটিভ জনগণ।আসল খবর, সত্য বা ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংস আসার আগ পর্যন্ত লোকজন ভাইরাল করে, চিতকার চেচামেচি করে ফাটাই ফেলে, পরে সত্য সামনে আসার পরে আরেক টপিকে চলে যায়।

আগেই বলেছি, আজকের আকাশ স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রজন্মের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে হলে, দক্ষ মিডিয়া কর্মী যেমন প্রয়োজন, তেমনি মুক্তিকামী রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবান আদর্শিক গণমাধ্যম এক্টিভিস্ট ও প্রয়োজন। যাদের পড়াশোনা আছে, জ্ঞান বুদ্ধি আছে।

মনে রাখা প্রয়োজন – অশিক্ষিত মানুষের মূর্খতা ও ধূর্ততা সমাজের যে ক্ষতি করে, তারচে বেশি ক্ষতি করে শিক্ষিত মানুষের অসততা ও উদ্দেশ্যমূলক ষড়যন্ত্র।

লেখাটি মতাদর্শের পক্ষে বিপক্ষের সকল গুরুত্বপূর্ণ মানুষের নজরে আসার জন্যই দিলাম। ধন্যবাদ।

সর্বশেষ

sakarya escort bayan bayan Eskişehir escort